
ছবি: সংগৃহীত
তিন মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও পর্যটকরা প্রবেশ করতে পারবেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই বনভূমিতে। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস প্রতিবছর বন বিভাগ সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির পুনরুজ্জীবন এবং প্রজনন মৌসুমে প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এই তিন মাসে পর্যটকের ভিড় না থাকায় সুন্দরবন পেয়েছে এক ভিন্ন রূপ। হরিণ, বানর, কুমির, জলজ প্রাণী থেকে শুরু করে পাখিদের অবাধ বিচরণে বন এখন অনেক বেশি প্রাণবন্ত। সুন্দরী, গেওয়া, গোলকাঠসহ নানা প্রজাতির গাছপালা যেন আরও সতেজ হয়ে উঠেছে। বনজুড়ে সবুজের আবরণে ছড়িয়ে আছে অনাবিল সৌন্দর্য। ফলে তিন মাস পর পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাওয়া এই বন এক নতুন সাজে সেজে উঠেছে।
খুলনা বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হাবিবুল ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে আগামী ১ সেপ্টেম্বরই সুন্দরবনে যাচ্ছেন। তিনি আগেই জাহাজ বুকিং করে রেখেছেন। তার ভাষায়, “সুন্দরবন এমন এক জায়গা যেখানে বারবার যেতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে বন্ধের পর বন এক নতুন রূপে জেগে ওঠে। তাই আমরা বন্ধুরা মিলে এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি।”
চাকরিজীবী সুলতান আহমেদ এবার পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবন ভ্রমণে। তিন বছর আগে অফিস সহকর্মীদের সঙ্গে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার স্মৃতিতে এখনো তাজা। তিনি বলেন, “এবার পরিবারের সবার জন্য এটি প্রথম ট্যুর। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হবে বলে আমরা দারুণ উচ্ছ্বসিত।”
খুলনা থেকে সুন্দরবনে প্রতি বছর প্রায় ৭০টিরও বেশি ছোট-বড় জাহাজ যাত্রী পরিবহন করে। এ বছরও সেই প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। জাহাজগুলো নতুন করে রং করা হয়েছে, ভেতরে সংস্কার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে কিছু ছোটখাটো সাজসজ্জা চলছে।
ফেমাস ট্যুর কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজীর হোসেন রুবেল বলেন, “তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকার সময় আমরা জাহাজগুলো সংস্কার করেছি। এবার ভ্রমণ হবে আরও বেশি রোমাঞ্চকর। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকৃতি থাকে অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর। কখনো হালকা বৃষ্টি, কখনো মেঘলা আকাশ—সবকিছু মিলে এক অনন্য দৃশ্য উপহার দেয়।”
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম ডেভিড বলেন, “আমাদের সব জাহাজই প্রস্তুত। আশা করছি, এবারও বিপুলসংখ্যক পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে আসবেন।”
সুন্দরবনের নাম শুনলেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। ভাগ্য ভালো হলে পর্যটকরা এই দুর্লভ প্রাণীর দেখা পেতে পারেন। এছাড়া বনজুড়ে হরিণের দল, কুমির, বানর, শুশুকসহ নানা জলজ প্রাণী আর অসংখ্য পাখির সমাহার দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে।
শুধু প্রাণী নয়, বৃক্ষরাজিও সুন্দরবনের সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। সুন্দরী, গেওয়া, গোলকাঠ, পশুর, কেওড়াসহ নানা প্রজাতির গাছপালা বনকে করে তুলেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। সমুদ্রের তীরবর্তী অংশে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন প্রকৃতির রূপকথা সাজিয়ে তোলে।
প্রতিবছর গড়ে দুই লক্ষাধিক দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে আসেন সুন্দরবনে। শুধু পর্যটন খাত থেকেই বন বিভাগ বছরে প্রায় চার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা যেমন—জাহাজ, নৌকা, গাইড, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, স্মারকসামগ্রী বিক্রেতা—সব মিলিয়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে এই বন।
তিন মাস বন্ধ থাকার পর আবারও খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ সাজে সেজে ওঠা এই বন এখন পর্যটকদের অপেক্ষায়। একদিকে রয়েছে প্রাণবৈচিত্র্যের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে রয়েছে সমুদ্র তীরবর্তী বনাঞ্চলের অবারিত সৌন্দর্য। আর তাই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্য আগামী কয়েক মাস হবে সুন্দরবন ভ্রমণের সেরা সময়।
বাংলাবার্তা/এমএইচও