
ছবি: সংগৃহীত
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলার তীব্রতা আবারও বেড়ে গেছে। একদিনের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৭ ফিলিস্তিনি। এর মধ্যে শুধু গাজা নগরীতেই নিহত হয়েছেন ৪৭ জন, আর অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন রুটি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে এই ঘটনায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় আখ্যা দিচ্ছে।
রোববার (৩১ আগস্ট) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি বাহিনীর লাগাতার বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদ অভিযানে গাজা নগরীর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নগরী ছেড়ে শত শত মানুষ জীবন বাঁচাতে পালাতে শুরু করেছেন। হাতে গোনা কিছু সামগ্রী গুটিয়ে নিয়েই পালাচ্ছেন তারা। কেউ ট্রাকের পেছনে, কেউ ভ্যানের ছাদে, আবার কেউবা গাধার গাড়িতে চেপে চলে যাচ্ছেন অজানা গন্তব্যে।
নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের পশ্চিম দিকে দেইর আল-বালাহ এলাকায় খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী তাবু ফেলেছেন অসংখ্য বাস্তুচ্যুত পরিবার। অনেকেরই এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ঘরবাড়ি হারানো। বোমাবর্ষণের ভয়ে তারা পূর্ববর্তী আশ্রয়ও ছেড়ে পালিয়েছেন। এর মধ্যেই আবারও আশ্রয় হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যাভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষকে দাঁড়াতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে। শনিবার এমনই এক লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিলেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা। হঠাৎ ইসরাইলি হামলায় সেখানেই প্রাণ হারান অন্তত ১১ জন। এই ঘটনাটি গাজায় মানবিক সংকটের ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
শুধু রাস্তাঘাট কিংবা খোলা মাঠ নয়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবন, কমিউনিটি সেন্টার ও সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে ইসরাইল। শনিবার একাধিক স্থাপনায় হামলায় সাতজন নিহত হন। ধ্বংসস্তূপে স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষকে মরিয়া হয়ে উদ্ধারকাজ চালাতে দেখা গেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ আশঙ্কা জানিয়েছে, আগস্টের শুরু থেকে ইসরাইলি বাহিনী হামলা জোরদার করেছে মূলত গাজা সিটিকে দখলে নেওয়ার লক্ষ্যেই। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তারা গাজা নগরী দখলের ‘প্রাথমিক ধাপ’ শুরু করেছে এবং এলাকাটিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা করেছে।
গাজার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, শনিবারই একদিনে মোট ৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও কম নয়। চিকিৎসকরা বলছেন, সীমিত সম্পদ, ওষুধের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে আহতদের সেবা দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ গাজার ভেতর থেকে জানান, হামলার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। “ঘরবাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল—কিছুই আর অক্ষত থাকছে না। মানুষের মৌলিক জীবনধারার ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে। পানি নেই, খাবার নেই, ওষুধ নেই। দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের মধ্যে যখন মানুষ বেঁচে থাকার লড়াই করছে, তখনই হামলা আরও বাড়ছে। পুরো পরিস্থিতি এক ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয়ে গড়াচ্ছে।”
বর্তমানে গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ দুর্দশা। অনাহার, পানির সংকট ও গৃহহীনতার সাথে যুদ্ধের আতঙ্ক প্রতিদিন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। বোমা হামলা থেকে বাঁচতে যারা ঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন, তারাই আবার অনাহার ও রোগব্যাধির শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতিকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচও