
ছবি: সংগৃহীত
চীন ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের জন্য নয়, গোটা এশিয়া এবং বৈশ্বিক রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে এনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, “ভারত ও চীনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ভালো প্রতিবেশী হওয়া এখন সময়ের দাবি। ড্রাগন এবং হাতির একত্রিত হওয়া কেবল দুই দেশের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।”
রোববার (৩১ আগস্ট) সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে চীনের তিয়ানজিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে এই মন্তব্য করেন শি জিনপিং।
প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, “বিশ্ব এখন বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারত বিশ্বের দুটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ, একইসাথে সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। গ্লোবাল সাউথের অংশ হিসেবে আমাদের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। তাই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভালো প্রতিবেশী হিসেবে একসাথে এগিয়ে যাওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “চীন-ভারত সম্পর্কের এ বছর ৭৫তম বার্ষিকী। এটি এমন এক সময় যখন আমাদের কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পর্ককে পরিচালনা করতে হবে। আমাদের ইতিহাসে যেমন সহযোগিতা আছে, তেমনি সীমান্তে টানাপোড়েনও আছে। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।”
চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমাদের অবশ্যই বহুপাক্ষিকতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। বিশ্বব্যবস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক করতে হবে। এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।”
অন্যদিকে বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “ভারত চায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাক। আমরা চাই—দুই দেশের মানুষের কল্যাণে আমাদের সম্পর্ক নতুন আস্থার ভিত্তি তৈরি করুক।”
মোদি আরও জানান, ভারতের স্বার্থে যেমন চীনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক জরুরি, তেমনি বৈশ্বিক শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ এমন সময়ে হলো, যখন সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন বিরাজ করছে। ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভয়াবহ সংঘর্ষে উভয় দেশের সেনা নিহত হয়। এরপর থেকেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক বৈঠকের মাধ্যমে কিছুটা অগ্রগতি হলেও পুরোপুরি অচলাবস্থা কাটেনি। গত বছর অক্টোবরে শি-মোদি সর্বশেষ বৈঠক করেছিলেন। তার পর এলএসি-তে সেনা সরানোর বিষয়ে একটি সীমিত অগ্রগতির ঘোষণা আসে।
প্রসঙ্গত, সাত বছরের মধ্যে এটিই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম চীন সফর। এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি শনিবার তিয়ানজিন পৌঁছান। সীমান্ত উত্তেজনার কারণে এতদিন দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা স্থবির হয়ে ছিল। ফলে এবারের সফরকে উভয় দেশেই কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত ও চীন সম্পর্কের জটিলতা শুধু সীমান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, বাণিজ্য ভারসাম্য—সব মিলিয়েই দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তবে শি জিনপিংয়ের ‘ড্রাগন ও হাতির ঐক্য’ প্রসঙ্গ এবং মোদির ‘বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা’ বার্তা ইঙ্গিত করছে—উভয় দেশ অন্তত কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের পাল্টাপাল্টি সমীকরণে ভারত-চীনের একে অপরের সহযোগিতা অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের প্রশ্নে এই সম্পর্ক নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।
যদিও শি-মোদি সাক্ষাতকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে সীমান্ত ইস্যুতে আস্থার ঘাটতি এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। একদিকে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এগিয়ে নিতে চাইছে, অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও কোয়াড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
ফলে আস্থা তৈরি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা দুই দেশের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির এই বৈঠক তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সৌজন্য বৈঠক নয়—বরং ভারত-চীনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশক। “ড্রাগন ও হাতির ঐক্য” কথাটি বাস্তবায়ন হলে শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়, পুরো এশিয়ার ভূরাজনীতির সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচও