
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “পুলিশ যখন অ্যাকটিভ হয় তখন বলা হয় তারা বেশি করে ফেলেছে, আবার যখন দেরি করে তখন অভিযোগ ওঠে কেন আগে থেকে ব্যবস্থা নিল না। আসলে নিয়ম হচ্ছে—ঘটনা ঘটার আগেই পুলিশ অ্যাকশনে যাবে।”
রোববার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং জনগণের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, “যে দলের জনগণের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, তারা চায় নির্বাচন না হোক। কিন্তু এ ধরনের অপচেষ্টা প্রতিহত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং প্রশাসন—সবার। কেউ যেন নির্বাচনকে বিঘ্নিত করতে না পারে, সেটিই এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
তিনি আরও বলেন, “জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। ঐক্যে ফাটল ধরলে দোসররা সুযোগ নেবে এবং বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।”
গতকাল জাতীয় পার্টির অফিসে অগ্নিসংযোগের পরই পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমালোচনা উঠেছে, কেন আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “পুলিশের কাজ হলো ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সব সময়ই কঠিন। অনেক সময় আগেভাগে পুলিশ অ্যাকশন নিলে বলা হয়—তারা অত্যধিক বলপ্রয়োগ করেছে। আবার দেরি করলে বলা হয়—তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তথ্য দিয়ে বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় ১ হাজার ৬০৪টি অবরোধ হয়েছে। এতে জড়িত ছিল ১২৩টি সংগঠন। তার মতে, এসব অবরোধ সরাসরি জনদুর্ভোগ তৈরি করে।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দাবিদাওয়া থাকতেই পারে। কিন্তু তা প্রকাশের জন্য রাস্তা অবরোধ করার প্রয়োজন নেই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা অন্যান্য মাঠে কর্মসূচি করলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে না। যানজটও কমবে।”
তিনি আরও জানান, “শুধু রাজধানীতে নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এসব যেন ধীরে ধীরে কমে আসে, সেজন্য সবার সহযোগিতা দরকার।”
মুন্সিগঞ্জে পুলিশের ক্যাম্পে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনাকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। হামলা বা অগ্নিসংযোগ—যে ধরনের নাশকতাই হোক না কেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আবারও জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের সময় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব দলের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। “যদি দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তারা লাভবান হবে। ফলে গণতন্ত্র ও নির্বাচন—দুটিই ঝুঁকিতে পড়বে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের এই বক্তব্য বাস্তবে কার্যকর করতে হলে পুলিশকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারভাবে আচরণ করতে হবে। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা কিংবা সন্ত্রাস ঠেকাতে পুলিশকে আগেভাগেই প্রস্তুত থাকতে হবে, তবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এড়ানোও জরুরি।
তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বিকল্প ভেন্যু ব্যবহারের পরামর্শ বাস্তবসম্মত হলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা মানতে চাইবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
জাতীয় পার্টির অফিসে অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় অবরোধ-সহিংসতা—এসব ঘটনাই প্রমাণ করছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পুলিশ আগে থেকে ব্যবস্থা নিলে “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” বলা হয়, আর পরে গেলে “অকর্মণ্যতা”—এই দ্বৈত সমালোচনা থেকেই বোঝা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান এখন এক কঠিন ভারসাম্যের লড়াইয়ে।
বাংলাবার্তা/এমএইচও