
ছবি: সংগৃহীত
এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। তবে এই অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য গত মে-জুন মাসে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি ও শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে। এর ফলে শিল্প, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বন্দর, আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদন, সেবা খাত লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।
গত ২৮ ও ২৯ জুন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কমপ্লিট শাটডাউন থাকে। আর এটি ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান। গত ২৬ জুন দুপুর ২টা ২৯ মিনিটে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে মার্চ টু এনবিআর এর জন্য কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকতে বলেন মারুফ। আর ২৮ জুন সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের এনবিআর ঐক্য পরিষদের ডাকে কমপ্লিট শার্টডাউন চলার ঘোষণা দেয় মারুফ, কাস্টম হাউসের অফিসারদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপে। এই যুগ্ম কমিশনার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ গ্রুপে যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন তার তথ্যাদি এসেছে বাংলাবার্তার হাতে। অথচ এই কাস্টম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে এই চতুর কাস্টমস কর্মকর্তা।
তবে ২৮ ও ২৯ জুন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস বন্ধ রেখে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করায় তখনকার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।
শুধু তাই নয়, একই অপরাধ দেখিয়ে আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করা ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামকে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় গত ১৮ আগস্ট।
তবে যে অপরাধ বা অভিযোগে এখন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করেছে,তার সবকিছু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান করলেও অজানা এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।যার ফলে এনবিআর কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা বাংলাবার্তাকে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের একই নীতিতে থাকা প্রয়োজন। যাদের বরখাস্ত করা হচ্ছে নিশ্চয় তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে করা হচ্ছে,কিন্তু তথ্য প্রমাণ সবকিছু থাকার পরও যাদের আন্দোলনে সম্পৃক্ততা ছিলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো ভালো জায়গাতে পদায়ণ করা কিংবা বীরদর্পে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াটা অন্যায়। যার ফলে মাঠ প্রশাসনে ভিন্ন বার্তা যাচ্ছে।
কেননা গত ২৬ জুন দুপুর ২টা ২৯ মিনিটে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপে মার্চ টু এনবিআর এর জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন মারুফ। আর ২৮ জুন সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের এনবিআর ঐক্য পরিষদের ডাকে কমপ্লিট শার্টডাউন চলার ঘোষণা দেয় মারুফ। যেখানে মারুফ একদিকে ঐক্য পরিষদের ব্যানারে চলা আন্দোলন সফল করতে কাস্টম হাউসে দায়িত্বরত কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজে বাঁধা প্রদান করেছেন একই সাথে কর্মসূচি সফল করার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশও দিয়েছেন। অপরদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা দিয়ে আমদানি রফতানি কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ করেছেন। যেখানে ২ দিন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস বন্ধ থাকায় প্রায় ৬শ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে মেসেজ এবং ফোন দেওয়া হলে তিনি কোন সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ঐক্য পরিষদের কর্মসূচিতে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ শুল্ক ২ শাখা। কিন্তু যিনি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস শাটডাউনের ঘোষণা দেন কর্মকর্তাদের মাঝে এবং দেশের আমদানি রফতানি কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ করে,রাজস্ব আহরণে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং তিনি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘুষের হাট বানিয়েছেন! এমন প্রশ্ন রাখা হয় সংস্থাটির প্রধানের কাছে।
অতপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বাংলাবার্তাকে বলেন, বিষয়টি জানানোর জন্য ধন্যবাদ। সরকার বিষয়টি তদন্ত করছে। যাদের সম্পৃক্ততা মিলবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার।
এদিকে মারুফুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল হওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ঘুষ,দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। মারুফুর রহমান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে দুর্নীতির আতুরঘরে পরিণত করেছেন। আর এমনই অভিযোগ প্রধান উপদেষ্টার মূখ্য সচিব,জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও গিয়েছে। কিন্তু অজানা কারণে নিশ্চুপ সংস্থাগুলো।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মারুফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়নে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারি কমিশনার রেজোয়ান আলমগীরসহ গঠিত সিন্ডিকেট মদ,সিগারেটের বিভিন্ন চালান থেকে ২-৪ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন।
আরও জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা নাজমুল হাসান এবং সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা মো নজরুল,রেজাউল এবং ফালতু রাজু প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি টাকা ঘুষ সংগ্রহ করে মারুফকে দেন। তাছাড়া গ্রিন চ্যানেল থেকে ফালতু রাজু অবৈধ ফেব্রিক্স আমদানির প্রতি চালান থেকে ২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে মারুফকে দেন। তাছাড়া অফ-ডক এ কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা মো কামাল হোসেনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি রফতানি চালান থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ নেন এই কাস্টম কর্মকর্তা মারুফ।
এই যুগ্ম কমিশনার এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো.রহমাতুল মুনিমের শ্যালক হিসেবে এনবিআরে সবার কাছে পরিচয় দিতেন এবং ভয়ভীতি দেখাতেন। এছাড়া বর্তমানে এনবিআরের ২জন মেম্বার এর নাম ভাঙ্গিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দুর্নীতির মাফিয়া হয়ে উঠেন। এছাড়া এই কর্মকর্তা বলে বেড়ান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের বর্তমান কমিশনার মো শফিউদ্দিন একজন অদক্ষ ও অপদার্থ কমিশনার,যিনি কাস্টসের কোন আইন কানুন বোঝেন না। তিনি সকলের কাছে বলে বেড়ান, তার উপরে এনবিআরের ২জন সদস্যর ছায়া আছে তার কিছুই হবে না। এমনকি তিনি বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের নিকট আত্মীয় বলে সব জায়গাতে নিজেকে জাহির করেন।
আরও জানা যায়, এই কাস্টম কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ২টি প্রিমিও গাড়ি যার মডেল নাম্বার ২০১৮-২০২২। এছাড়া নতুন করে তিনি একটি হ্যারিয়ার গাড়ি ক্রয় করেছেন। এই হ্যারিয়ার গাড়িতে করে উঠতি বয়সি নানা মডেলদের সাথে তার সখ্যতা রয়েছে। মারুফুর রহমানের নারীঘটিত কারণে তার প্রথম স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার বর্তমান স্ত্রী,সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে বসবাস করেন। এমনকি স্ত্রীকে লন্ডনে বাড়ি কিনে দিয়েছেন এবং সন্তানরা লন্ডনে পড়ালেখা করছে।
একজন ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা কিভাবে সন্তানদের লন্ডনে পড়ালেখা করান এবং স্ত্রীকে বাড়ি কিনে দেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই কর্মকর্তার চাকরি রয়েছে ২০৪৪ সাল পর্যন্ত।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাবার্তাকে বলেন, বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দুদকের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এভাবে যদি তথ্য প্রমাণ থাকার পরও দুর্নীতিবাজরা অধরা থেকে যান তাহলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিষয়টি দায়িত্বশীলদের কঠোরভাবে দেখা উচিত।
বাংলাবার্তা/এসজে