
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম। ইতোমধ্যেই এনবিআরকে দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে— রাজস্বনীতি ও রাজস্বব্যবস্থাপনা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি, ঘুষ ও করদাতাদের হয়রানির অভিযোগে পর্যায়ক্রমে পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধাপে ধাপে বদলি করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের উন্নয়ন ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক কার্যক্রম রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, “করদাতাদের হয়রানি বা ভোগান্তিতে ফেলার মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে।”
আন্দোলন ও রাজস্ব ক্ষতি
গত ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুই বিভাগে ভাগ করার অধ্যাদেশ জারি হলে বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্দোলনে নামে। প্রায় দুই মাস ধরে চলা এ আন্দোলনের কারণে স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়, পণ্যের জট সৃষ্টি হয়, রপ্তানি ব্যাহত হয়। এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বদলির মাধ্যমে শুদ্ধি অভিযান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরই বদলি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে একসঙ্গে ২২৫ কর পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন ধাপে ৬০০ কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে আরও কয়েক দফায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হবে।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই পদে থেকে ব্যক্তিগত বলয় তৈরি করেছেন এবং করদাতাদের জিম্মি করে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। আবার অনেক যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তা কেবল লবিং বা গ্রুপিং না করার কারণে ভালো পদে কাজ করার সুযোগ পাননি। তাই বদলি কার্যক্রমের মাধ্যমে সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টনের চেষ্টা চলছে।
শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, যেমন— দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও ভ্যাট তদন্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে এনবিআরের দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সদস্য ও কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাও রয়েছেন। শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা করার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ মনে করেন, এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী। তার মতে, “কিছু অসৎ কর্মকর্তার কারণে এনবিআরের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। যদি সরকার কঠোর অবস্থান নেয় এবং সৎ কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করে, তাহলে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসবে।”
নতুন কাঠামোতে নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথক
১২ মে জারি করা রাজস্বনীতি ও রাজস্বব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এনবিআর এখন দুটি ভাগে বিভক্ত। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও ন্যায্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রাজস্বনীতি বিভাগের সচিব হবেন সামষ্টিক অর্থনীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কোনো সরকারি কর্মকর্তা। অন্য পদগুলোতে আইন, হিসাব-নিরীক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও বাণিজ্য নীতি বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
সামনে যা আসছে
এনবিআরে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৪৩৪ কর্মকর্তা এবং ১০ হাজার ১৯৫ জন সহায়ক কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও অনৈতিক কাজে জড়িতদের বাদ দিয়ে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, এই সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে করদাতাদের ভোগান্তি কমবে, রাজস্ব আদায়ে গতি আসবে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে