ছবি: সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানে এবং এর আশপাশে শুক্রবার ভোররাতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে অঞ্চলটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো একযোগে জানিয়েছে, ইসরাইল ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল একাধিক সামরিক স্থাপনা। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই হামলার ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে কিছু সময় ধরে এলাকাজুড়ে তীব্র শব্দ শোনা যায় এবং একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা নিশ্চিত করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা নূর নিউজ নিশ্চিত করেছে যে এটি একটি বহিরাগত বিমান হামলা, এবং আলজাজিরাও এই তথ্য নিশ্চিত করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এক্সিয়স জানিয়েছে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, ইসরাইল ইরানে একটি প্রত্যক্ষ বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র কোনভাবে সহায়তা করেনি বলেও তারা দাবি করেন।
অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা দেশটির সেনাবাহিনী এখনও এই হামলার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি। তবে টাইমস অব ইসরাইল জানায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গালান্ত কার্টজ হামলার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসরায়েলজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
এই হামলার সম্ভাবনা আগেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়েকদিন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইসরাইল ইরানের ওপর সরাসরি আঘাত হানতে প্রস্তুত। তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা ঘনীভূত হচ্ছিল।
এই আক্রমণের ফলে ইরান-ইসরাইল বৈরিতা আরও বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে চলমান পরমাণু আলোচনা থেকে সরে আসতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ। ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে দায়ী না করলেও, এর প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের জবাব দান এখন সময়ের ব্যাপার, এবং সেটা সরাসরি ইসরাইলের ভূখণ্ডে, অথবা লেবাননের হিজবুল্লাহ বা সিরিয়ায় তাদের মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে হতে পারে।
ইসরাইলি হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন শুরুতে সতর্ক অবস্থান নেয়। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা হামলার বিষয়ে আগে থেকে জানতেন না এবং কোনো ধরণের সহায়তা করেননি। তবে সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে এখন চরম সতর্কতায় আছে।
এছাড়া, ইসরাইলি পদক্ষেপের কারণে হোয়াইট হাউস অভ্যন্তরীণভাবে ইরান ও ইসরাইল উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা রাখছে, যেন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। কারণ এই সংঘাত বড় আকারে রূপ নিলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং শরণার্থী সংকট নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের এই হামলা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হতে পারে। আবার অনেকেই এটিকে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট বা নিরাপত্তা হুমকির জবাব বলেও ব্যাখ্যা করছেন।
বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এই হামলার পর। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কূটনীতিকরা এখন সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি চীন ও রাশিয়াও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এক নতুন যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা, তা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে ‘সীমিত হামলা’ বললেও এর প্রতিক্রিয়া হতে পারে বিপুল ও সুদূরপ্রসারী।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



