প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের দুটি শীর্ষ সংস্থা—আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) প্রকাশিত তাদের এক যৌথ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর শ্রম থেকে মুক্ত হয়েছে। এই অগ্রগতি মূলত স্কুলে ভর্তি হার বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রচার প্রচেষ্টার কারণে সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমগ্র শিশুশ্রমে চূড়ান্ত কমেনি, বরং সামান্য বেড়েছে
যদিও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে শিশুদের হার কমেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে শিশুশ্রমের হার কমার পরিবর্তে কিছুটা বেড়েছে। ২০১৩ সালে শিশু শ্রমে যুক্ত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে ‘ক্ষতিকর কাজে’ যুক্ত শিশুশ্রমের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেক শিশু এখনো পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন ধরনের শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে বা কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায় না, তাদের সন্তানেরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমে নামতে বাধ্য হচ্ছে।
কোন খাতে কত শিশু কাজ করছে
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় অংশটি এখনো কৃষি খাতে নিয়োজিত রয়েছে। মোট শিশুশ্রমের মধ্যে ৬১ শতাংশই এই খাতে। এরপরে রয়েছে সেবা খাত, যেখানে ২৭ শতাংশ শিশু গৃহস্থালি কাজ, হোটেল-রেস্তোরাঁ বা বাজারে পণ্য বিক্রির মতো কাজে যুক্ত। শিল্প খাতে—যেমন পোশাক, উৎপাদন, কারখানা কিংবা ক্ষুদ্র খনি খাতে কাজ করছে ১৩ শতাংশ শিশু। এসব খাতের অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক, যেখানে শিশুরা কোনো আইনি সুরক্ষা ছাড়াই দীর্ঘ সময় শ্রম দিয়ে থাকে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিতেও থাকে।
বড় অগ্রগতি শিক্ষায়, তারপরও চ্যালেঞ্জ
আইএলও ও ইউনিসেফ জানায়, গত এক দশকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তির হার এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাবে অনেক শিশু শ্রমের পরিবর্তে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ও এনজিওদের চালানো সচেতনতা কার্যক্রম এবং পাইলটভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং কাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। সামাজিক সুরক্ষার অভাব এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার অভিগম্যতা না থাকলে অনেক শিশু পুনরায় শ্রমে ফিরতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে দরিদ্রতা বৃদ্ধির কারণে কিছু এলাকায় শিশুশ্রমের হার বেড়েছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ
এই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের বৈশ্বিক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী এখনো প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিযুক্ত। এর মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, যা তাদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশকে হুমকির মুখে ফেলে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তুলনামূলক উন্নতি লক্ষ্য করা গেলেও, শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল থেকে এখনও দূরবর্তী। দেশের সামগ্রিক শিশুশ্রম পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল, উপকূল, চা-বাগান এলাকা এবং শহরাঞ্চলের বস্তিগুলোতে।
ইউনিসেফের মন্তব্য ও সুপারিশ
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “আমরা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে স্বীকৃতি দিই। এটি প্রমাণ করে যে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা, সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে এখনো শিশুশ্রমের সামগ্রিক হার অপরিবর্তিত থাকায় আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে হলে আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে এবং এই বিষয়ে সরকারের বাজেট ও নীতিগত অগ্রাধিকার আরও বাড়াতে হবে।”
প্রতিবেদনে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং সিভিল সোসাইটির প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও করা হয়েছে:
জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা: দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে, যেন তারা শিশুশ্রমের উপর নির্ভর করতে না হয়। ‘সর্বজনীন শিশু ভাতা’ এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ হতে পারে।
শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সনাক্ত করা যায়, শিশুশ্রম রোধ করা যায় এবং তাদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে সহায়তা দেওয়া যায়।
শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি: প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্পন্ন ও কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে ছিটকে না পড়ে এবং শ্রমে না নামতে হয়।
বড়দের জন্য সম্মানজনক কাজের সুযোগ: অভিভাবকদের জন্য উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে পরিবারগুলোর আয়ের বিকল্প থাকে এবং তারা শিশুদের কাজে পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব না করে।
বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হ্রাসে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, যা সরকারের নানা উদ্যোগ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল। তবে সামগ্রিক শিশুশ্রমের হার ও ক্ষতিকর শ্রমের বিস্তার এখনো উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, বাস্তবভিত্তিক, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিকল্পনা ও বিনিয়োগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শ্রমের যাঁতাকল থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই আরও সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



