ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সরকারের রাজস্ব আহরণ। এই রাজস্বের ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য এমন উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
ইংরেজি একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘তোমার গন্তব্য যদি দুই মাইল দূরে হয়, তবে তিন মাইল হাঁটার প্রস্তুতি নাও, তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।’ সরকারও যেন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই কৌশল অনুসরণ করে। অর্থাৎ সম্ভাব্য আদায়ের তুলনায় অনেক বেশি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যাতে বাস্তবে কিছুটা কম হলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে আর্থিক চাপ বাড়ছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অথচ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এনবিআরের প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগের পরিবেশ, শিল্প উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং ভোগব্যয়—সবকিছুর ওপরই রাজস্ব আদায় নির্ভর করে। অর্থনীতি যদি কাঙ্ক্ষিত গতিতে না চলে, তাহলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত হবে।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মতে, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা কেবল কর প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রতিফলন। তিনি বলেন, কর অবকাশ, করহার যৌক্তিকীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারিত হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে চাপ, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান সমস্যা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট উৎপাদন ও ভোগ উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে করযোগ্য আয়ের পরিমাণও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। তাই করভিত্তি সম্প্রসারণ ছাড়া কেবল করহার বৃদ্ধি বা উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন, তথ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে রাজস্ব আহরণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তুলতে না পারলে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে করছেন তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো কর অব্যাহতির বিস্তৃতি। বছরের পর বছর বিভিন্ন খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনা বাড়তে থাকায় সরকারের কর ব্যয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সম্ভাব্য রাজস্বের একটি বড় অংশ আদায়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে করের ভিত্তিও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসার ব্যয় কমানোর জন্য বাজেটে কিছু উদ্যোগ থাকলেও ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। অথচ আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা জরুরি। করদাতাদের জন্য জটিলতা কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
করভিত্তি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিপুলসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর নেটের বাইরে থাকা। দেশে ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি ব্যবসা ইউনিট থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখেরও কম। একইভাবে সম্ভাব্য আয়করদাতার তুলনায় নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা অনেক কম। ফলে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ভ্যাট ও আয়কর নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে রিটার্নে প্রতিফলিত নিশ্চিত করা গেলে কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থাও বাড়বে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনিক সক্ষমতার পাশাপাশি বহিরাগত নানা চ্যালেঞ্জও রাজস্ব আহরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। ফলে উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, প্রতিবছরই উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় পিছিয়ে রয়েছে, ফলে শেষ প্রান্তিকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ছাড়া আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পেয়েছে এবং কার্যকরী মূলধনের প্রবাহেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, করজাল এখনো পর্যাপ্ত বিস্তৃত হয়নি এবং এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে এত উচ্চ প্রবৃদ্ধির রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন বাস্তবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের (সিআই) রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার জনতুষ্টিমূলক বেশ কিছু অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। ব্যক্তিগত করহার যৌক্তিক রাখা, বিনিয়োগে কর কমানো এবং জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে করছাড়ের ঘোষণা ইতিবাচক হলেও এসবের অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ ব্যয় এবং সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সরকার বলছে করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, দুর্নীতি কমানো এবং কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েই সংশয় রয়েছে।
তার মতে, রাজস্ব প্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং করভিত্তি সম্প্রসারণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে অথবা বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



