ছবি: সংগৃহীত
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চূড়ান্ত করেছে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এই বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের এই বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)ও বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের প্রত্যাশা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের প্রবাহ বাড়লে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে লেনদেন বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভ্যাট, শুল্ক, আয়কর এবং উৎসে কর আদায়ের ওপর।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় শুধু সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং সেবাখাতসহ পুরো অর্থনীতিতে বহুমুখী কার্যক্রম সৃষ্টি করে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সরকারের জন্য নতুন রাজস্বের উৎস তৈরি হয়। বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, পাথর, ইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন আমদানিনির্ভর উপকরণ ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ও শুল্ক আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপির মধ্যে যদি অন্তত ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে এই ব্যয় থেকে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়ায় এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ও তুলনামূলক কম হয়েছে। তাদের ধারণা, এবার বাস্তবায়নের গতি বাড়লে শুধু এডিপি সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকেই চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব হবে।
কর্মকর্তারা জানান, উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের বিধান রয়েছে। গড় হিসেবে প্রায় ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হলে ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বিপরীতে ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হতে পারে। এ ছাড়া আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর ওপর আরোপিত শুল্ক থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী কোম্পানি, প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বৃদ্ধি পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে আয়কর আদায় হয় এবং বিল পরিশোধের সময় উৎসে করও কেটে রাখা হয়। ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের একটি অংশ করের মাধ্যমে পুনরায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরে আসে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের উন্নয়ন ব্যয় যত বাড়ে, অর্থনীতিতে করযোগ্য কর্মকাণ্ডও তত বৃদ্ধি পায়। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয় করা হয়, যার প্রতিটি ধাপে ভ্যাট ও কর আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, যা ভোগ ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ধারাবাহিকতায় সামগ্রিক রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতিতে একটি বহুগুণক (মাল্টিপ্লায়ার) প্রভাব সৃষ্টি করে। সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে যে অর্থ বাজারে প্রবেশ করে, তা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ঘুরে আরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। এর ফলে উৎপাদন, বাণিজ্য এবং সেবাখাত সম্প্রসারিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও এর সুফল অনেকাংশে নির্ভর করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। তিনি বলেন, প্রকল্পের ধরন, আমদানিনির্ভরতা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং বাস্তবায়নের গতি—সবকিছু মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ শুধু বড় অঙ্কের এডিপি ঘোষণা করলেই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পাওয়া যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তিনি আরও বলেন, যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি কিংবা অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমও কমে যাবে এবং সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্ব অর্জন ব্যাহত হতে পারে। তাই উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের আশা, আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতি পেলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় রাজস্ব আহরণে প্রতিফলিত হবে। ফলে ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই ত্বরান্বিত করবে না, বরং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



