ছবি: সংগৃহীত
বর্তমানে কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলটির দীর্ঘদিনের নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তার ভাষায়, “গত ১৬ বছরে আমাদের অনেক ভুল ছিল। তা না হলে আজকের এই পরিণতি কেন হবে? এই অবস্থা আসলে আমাদেরই ভুলের শাস্তি।” দীর্ঘদিনের সহকর্মী, রাজনীতির উত্থান-পতনের এক প্রজন্মের সাক্ষী, এবং আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার নিরবিচার অভিজ্ঞতা থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতির এমন আত্মজিজ্ঞাসামূলক মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও আলোড়ন তুলেছে।
সম্প্রতি দীর্ঘ এক চিকিৎসা সফর শেষে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরেছেন অসুস্থ আবদুল হামিদ। তার শ্যালক এবং সফরসঙ্গী ডা. আনম নওশাদ খান জানান, ৭ মে থেকে এক মাস তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানেই পারিবারিক আলাপচারিতার এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দুর্দশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আবদুল হামিদ তার মনোভাব প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান তিনি।
নওশাদ বলেন, “ভগ্নীপতি প্রায়ই বলেন, ২০১২ সালে যখন আমি স্পিকার ছিলাম, তখনই বলেছি—সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে জনগণ বেশিদিন সায় দেবে না। আমরা সেটা বুঝিনি, এখন বুঝছি।”
আওয়ামী লীগের দুর্দিনেও দলের সাবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের। নওশাদ জানান, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হামিদের কোনো কথা হয়নি। দুই পক্ষের কেউই উদ্যোগও নেয়নি। এমনকি সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ নেই। তিনি এখন পুরোপুরি পারিবারিক পরিবেশে রয়েছেন, কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত নন।
তবে শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহ একটুও কমেনি। নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন এবং সুযোগ পেলেই টেলিভিশনেও রাজনীতি সংক্রান্ত খবর দেখেন। নওশাদ বলেন, “তিনি এখনো দেশের খবর খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেন। তবে বেশিরভাগ সময় নিজের ভেতরই গুটিয়ে থাকেন। নিজের দলের এই অবস্থা দেখে খুব মুষড়ে পড়েছেন।”
আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও আওয়ামী লীগের অনেক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন—এমন কথাও জানান তার শ্যালক। “তিনি নিজেই বলেন, আমি একমাত্র অনেক কথা বলতাম। এজন্য অনেকে আমাকে পছন্দ করত না।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকে নিরপেক্ষভাবে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখার সুযোগ থাকায় আবদুল হামিদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা উচিত।
৮২ বছর বয়সি এই প্রবীণ নেতা বর্তমানে লাং ক্যানসারের থ্রি-টু-ফোর স্টেজের মাঝামাঝিতে অবস্থান করছেন, যেটিকে চিকিৎসকরা ‘লাস্ট স্টেজ’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। রোগ অনেকাংশে ছড়িয়ে গেছে। চলাফেরার জন্য অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। নিজে নিজে বাথরুমে যেতে পারেন না, এমনকি নামাজ-কালামও পড়তে পারেন না।
এই অবস্থায় দেশেই থাকতে চেয়েছেন আবদুল হামিদ। নওশাদ বলেন, “অনেকে বলেছেন, আপনি না দেশে ফিরে বিদেশেই থেকে যান। কিন্তু উনি বলেছেন, না, আমি দেশে ফিরবই। দেশে ফিরে যদি মরতেই হয়, দেশের মাটিতে মরব। এখানেই আমার আত্মীয়-স্বজন, এখানেই আমার জায়গা।”
দারুণ খোলামেলা ভঙ্গিতে আবদুল হামিদ তার বর্তমান শারীরিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার কথাও ব্যক্ত করেছেন। “নামাজ-কালাম তো পড়ি নাই। আল্লাহই জানেন কী হয়”—এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। নওশাদ খান জানান, তিনি আবদুল হামিদকে বলেছেন, “আপনি তো অনেক মানুষের উপকার করেছেন, কারও ক্ষতি করেননি। আল্লাহ নিশ্চয়ই মাফ করবেন।”
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় আবদুল হামিদ হাওড়ের সন্তান। সাতবার নির্বাচিত এমপি, সংসদের ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার ও শেষতক রাষ্ট্রপতি হিসেবে টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তবু হাওড়ের মাটি তাকে সবসময়ই টানত। বঙ্গভবনের চার দেয়ালকে ‘বন্দিজীবন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন কিশোরগঞ্জের হাওড়ে। অসুস্থতা সত্ত্বেও সেখানকার খোঁজখবর আজো রাখেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সরকার বলেন, “আবদুল হামিদের এই মন্তব্য প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগের ভেতরেও আত্মসমালোচনার একটি ধারা রয়েছে। কিন্তু তা কখনোই দলগত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি, যা তাদের পতনের অন্যতম কারণ।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আহসানুল কবির বলেন, “সাবেক রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দলটির ভিতরে থাকা অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও আত্মতৃপ্তির রাজনীতি আজকের পরিণতির জন্য দায়ী। সময় থাকতে শেখ হাসিনা যদি এমন সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।”
আবদুল হামিদের চোখে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখা যাচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর অল্প কথায়ই পাওয়া যায়। তার মতে, “ভবিষ্যতে যদি রাজনীতিতে ফিরতে হয়, তাহলে আওয়ামী লীগকে আত্মসমালোচনায় যেতে হবে। অতীতের ভুলগুলোর স্বীকারোক্তি ও সংশোধন ছাড়া নতুন করে কোনো গণভিত্তি তৈরি করা সম্ভব নয়।”
আওয়ামী লীগের সাবেক এক প্রেসিডেন্টের আত্মবিশ্লেষণমূলক এই বক্তব্য শুধু দলটির জন্যই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার শেষ পরিণতি নিয়ে আবদুল হামিদের উপলব্ধি, ভুল রাজনীতির পরিণতি সম্পর্কে তার খোলামেলা স্বীকারোক্তি—এগুলো যদি রাজনীতিকরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যতের পথ কিছুটা হলেও আলোর দিকে এগোবে। অন্যথায়, এই শ্বাসরুদ্ধকর রাজনীতির আবহে দেশ আরো গভীর অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



