ছবি: সংগৃহীত
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে ‘সবার বাজেট’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ বাজেট কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; দেশের সব মানুষের প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও জীবনমানের উন্নয়নকে সামনে রেখেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কৃষক, নারী, শিল্পী, থিয়েটারকর্মী, কামার-কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সমাজের এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই, যাদের কথা এবারের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করার পর গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “এবারের বাজেটের মূল দর্শন
হচ্ছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূল সুবিধাগুলো সীমিত কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল।
ফলে সমাজের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থেকে গেছে। বর্তমান সরকার সেই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে চায়।”
তিনি বলেন, ‘আমরা অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে।
সে কারণেই বাজেট প্রণয়নের সময় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয়, বরং দেশের প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যেক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেটের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন, তারপর আসে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময়টিতে বাজেটের সত্যিকার যে কার্যক্রম, যেটিতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটার কথা, সেই বিষয়টি আমরা বহু বছর ধরে করে আসছি। দেড় দশকের বেশি সংগ্রামের পর সবার একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছি।
সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা অনেক। সেসবের প্রতিফলন ঘটাতে আমরা চেষ্টা করেছি সবার সঙ্গে কথা বলতে ও মতামত নিতে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরো বলেন, ‘বিগত সময় দেশের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যে কারণে আমরা সম্পদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই সীমাবদ্ধতা, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আবার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বাজেট করা ছিল কঠিন বিষয়। আমরা চেষ্টা করেছি প্রতিটি মানুষকে এই বাজেটের আওতায় নিয়ে আসতে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের স্লোগান ছিল অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ করা। এর আগে অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার, কিছু মানুষের, কিছু গোষ্ঠী কিংবা সংঘবদ্ধ কোনো গোষ্ঠীর জন্য। যে মানুষগুলো সংঘবদ্ধ না, তারা অর্থনীতির ভাবনার বাইরে ছিলেন। আমরা তাঁদের আনার চেষ্টা করেছি। বাজেট বাস্তবায়ন করতে কী করতে হবে, সেই রোডম্যাপও দেওয়া হয়েছে। এই বাজেটের ভাবনা-চিন্তা ও দর্শন একটু ভিন্ন।’
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি
প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার ব্যবস্থা নয়, বরং সম্পত্তি লেনদেনে প্রকৃত মূল্য ঘোষণার মাধ্যমে করসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের একটি প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। এ বিষয়ে জনমনে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত অর্থবছরে জমি বিক্রেতাদের জন্য একটি বিশেষ বিধান করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে জমি প্রকৃত মূল্যে বিক্রি হলেও কম দামে নিবন্ধন করা হয়। এতে বিক্রেতারা প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের অতিরিক্ত অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন। এ অবস্থায় ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ এবং বায়নানামা উপস্থাপন করতে পারলে তাঁরা নিয়মিত হারে মূলধনী মুনাফার ওপর কর পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ পান।’
ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার তাগিদ
দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল বা ডি-রেগুলেশন জরুরি। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। ফলে অর্থনীতি আবারও ঋণনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়তে পারে।’
সংস্কৃতিকে অর্থনীতির সম্পদে রূপ দিতে ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প
দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরির লক্ষ্যে পর্যটনের সঙ্গে থিয়েটার, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “অভ্যন্তরীণ পর্যটনের সম্প্রসারণ স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বিনোদন খাতের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সিনেমা, সংগীত ও থিয়েটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘সফট পাওয়ার’ গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু বিদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্য বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে পারলে তা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বর্তমানে দেশে বিনোদনের সুযোগ সীমিত, থিয়েটার, ডিজাইন, আর্ট ও মিউজিকের মতো সৃজনশীল খাতগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’র আওতায় আনা হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশ সিনেমা, গান ও থিয়েটারের মাধ্যমে নিজেদের সফট পাওয়ার গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোতে চায়। এর ফলে একদিকে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরো শক্তিশালী হবে।’

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে বাপেক্সকে আরো সক্রিয় করা হচ্ছে
দেশে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কম্পানিকে (বাপেক্স) আরো সক্রিয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘১৭ বছরে স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার দিকে চলে গেছে।’
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘বাপেক্সের সফলতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়াতে আরো পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘উপসাগরীয় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানিসংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে উচ্চমূল্যে বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্র (আইপিপি) থেকে বিদ্যুৎ কিনে ভোক্তাদের কাছে কম দামে বিক্রি করায় বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে লোকসান হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে হচ্ছে।’
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রথমেই আইপিপিগুলোর বকেয়া ৫৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের চাপ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি চলমান বিল পরিশোধের দায়ও রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ব্যাটারিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারিসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও করছাড় দেওয়া হয়েছে।
মৌজা রেট বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ চলছে
জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বিদ্যমান বড় ব্যবধান দূর করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মৌজা রেট বাস্তবসম্মত করা গেলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগও অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে মৌজা রেট প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে বাজেট প্রণয়নের আগে এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন দেশব্যাপী মৌজাভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিজমি ও অন্যান্য জমির জন্য পৃথক মূল্যায়ন করা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেটের মূল শক্তি এর বাস্তবায়নে। পরিকল্পনা ও নীতিমালা যতই ভালো হোক, কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।’
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনার ৮০ শতাংশও যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সুশাসনের সমন্বয়ে দেশ একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি অর্জন করবে বলে আশা করছি।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



