ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে আদালত, আপিল কর্তৃপক্ষ ও ট্রাইব্যুনালে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের বকেয়া ভ্যাট আদায়ে এবার বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ফাঁকির মামলায় আরোপিত চক্রবৃদ্ধি সুদের বড় অংশ থেকে ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি দ্রুত হয় এবং সরকার আটকে থাকা রাজস্ব হাতে পায়। এনবিআরের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই বিশেষ সুবিধার ফলে আগামী অর্থবছরেই অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশে ভ্যাট সংক্রান্ত বহু মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার মূল করের অঙ্কের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ যোগ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য অর্থ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এককালীন এত বড় অঙ্ক পরিশোধে আগ্রহ হারিয়েছে এবং মামলা নিষ্পত্তির পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা দেখা গেছে। এই অচলাবস্থা দূর করতেই সরকার বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, সরকারের মূল লক্ষ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে প্রকৃত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। সে কারণে চক্রবৃদ্ধি সুদের পরিবর্তে সীমিত সময়ের জন্য সহজ শর্তে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে সরকারও দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিপুল অর্থ রাজস্ব হিসেবে আদায় করতে পারবে।
অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই কর আদায়ের স্বার্থে সময়ে সময়েই সুদ বা জরিমানায় বিশেষ ছাড় দিয়ে করদাতাদের বকেয়া পরিশোধে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বহু বছরের অমীমাংসিত মামলা নিষ্পত্তির পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের ৩৭(৩) ধারায় বকেয়া, কম পরিশোধিত কিংবা ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের ওপর মাসিক ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপের বিধান ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে ভ্যাট পরিশোধ না করলে প্রতি মাসে সুদ যোগ হতে থাকত এবং সেই সুদের ওপর আবার নতুন করে সুদ যুক্ত হয়ে পরিশোধযোগ্য অর্থ দ্রুত বৃদ্ধি পেত। পরে ২০১২ সালের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন কার্যকর হলেও শুরুতে একই ধরনের সুদের হার বহাল ছিল। পরবর্তীতে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ হার কমিয়ে মাসিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
তবে সুদের হার কমানো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলমান থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের দায় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে মূল ভ্যাটের পরিমাণ ১ কোটি টাকা হলেও বছরের পর বছর ধরে সুদ যুক্ত হতে হতে মোট দায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। এত বড় অঙ্ক একসঙ্গে পরিশোধ করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা মামলা নিষ্পত্তির পরিবর্তে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াকেই তুলনামূলক সুবিধাজনক মনে করে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর।
এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—এই তিন খাতে মোট বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ভ্যাট খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আয়কর খাতে বকেয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং কাস্টমস খাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। অর্থাৎ মোট বকেয়া রাজস্বের প্রায় অর্ধেকই ভ্যাট সংশ্লিষ্ট।
শুধু ভ্যাট খাতেই বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার মামলা বিভিন্ন স্তরে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার একটি বড় অংশ আপিল কমিশনারেট, আপিলাত ট্রাইব্যুনাল এবং উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলাও এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলা, গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মামলা উল্লেখযোগ্য। এসব মামলা নিষ্পত্তি হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে বলে মনে করছে এনবিআর।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থবিল ২০২৬-এ নতুন করে ‘ধারা ১৩৭ক’ সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের অধীনে সৃষ্ট বকেয়া কর, জরিমানা বা অন্যান্য পাওনা আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করলে চক্রবৃদ্ধি সুদের পরিবর্তে মাসিক ২ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ২৪ মাসের সরল সুদ পরিশোধ করলেই দায় পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত চক্রবৃদ্ধি সুদের বিশাল বোঝা বহন করতে হবে না।
একই ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে ২০১২ সালের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের অধীনে সৃষ্ট বকেয়ার ক্ষেত্রেও। ১ জুলাই ২০২২ সালের আগের বকেয়া আগামী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করা হলে প্রযোজ্য হারে ২৪ মাসের সরল সুদ দিলেই হবে। অতিরিক্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ করা হবে না। সরকারের আশা, এই সুবিধা বহু প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বকেয়া পরিশোধে উৎসাহিত করবে।
তবে এই সুবিধা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে স্বাভাবিক আইনি বিধান অনুযায়ী দায় বহাল থাকবে। ফলে করদাতাদের জন্য এটি এক ধরনের বিশেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে বহু পুরোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। তাদের মতে, চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে মূল করের তুলনায় দায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মামলা ঝুলিয়ে রাখত। এখন সুদে ছাড়ের সুযোগ থাকায় তারা সমঝোতার ভিত্তিতে বকেয়া পরিশোধে আগ্রহী হতে পারে। এতে সরকার যেমন দ্রুত রাজস্ব পাবে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের আইনি অনিশ্চয়তাও দূর হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং বাস্তবসম্মত উপায়ে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। বহু বছর ধরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও সুদ কমানো বা মওকুফের দাবি জানিয়ে আসছিল। এখন তারা যদি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বকেয়া পরিশোধ করে, তাহলে রাষ্ট্র ও ব্যবসা—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
সুদে ছাড়ের পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলার আপিল ব্যবস্থাও সহজ করা হয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল কমিশনারেটে যেতে বিতর্কিত করের ১০ শতাংশ, আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আরও ১০ শতাংশ এবং উচ্চ আদালতে যেতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ আগাম জমা দিতে হয়। এই উচ্চ অঙ্কের আগাম জমার কারণে অনেক করদাতা আইনি প্রতিকার চাইতেও নিরুৎসাহিত হন।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, আপিল কমিশনারেটে যেতে আগাম জমার হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। একইভাবে আপিলাত ট্রাইব্যুনালে যেতে ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ এবং উচ্চ আদালতে যেতে ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ আগাম জমা দিলেই চলবে। এনবিআরের মতে, এতে করদাতাদের জন্য আপিল প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির পরিবেশ তৈরি হবে।
রাজস্ব বিশ্লেষকদের ধারণা, সুদে ছাড় এবং আপিল ব্যবস্থার শর্ত শিথিল—এই দুই পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ভ্যাট মামলার উল্লেখযোগ্য অংশ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে গতি আসবে এবং আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের যে আশা করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



