ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নবায়ন কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিরামহীনভাবে দফায় দফায় বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। যার শুরু হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এখনো যা অব্যাহত আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-খেলাপি ঋণ কমছে না। উলটো লাগামহীনভাবে বাড়ছে। এমনকি বিশেষ ছাড়ে যেসব খেলাপি ঋণ নবায়ন নবায়ন করা হচ্ছে, সেগুলোও বছর না ঘুরতেই ফের খেলাপির খাতায় নাম লেখাচ্ছে।
এদিকে ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ওই এক বছরে বিশেষ ছাড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। আগের খেলাপি নবায়ন করা ঋণসহ এখন পর্যন্ত পুনঃতফসিল করা মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট নবায়ন করা স্থিতির প্রায় ৪০ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়মিত রয়েছে।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছর এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, নবায়ন, ফের খেলাপি হওয়া, মূলধন ঘাটতি, প্রবিশন ঘাটতি, ব্যাংকের দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ, আয়-ব্যয় ইত্যাদি সব ধরনের তথ্য তুলে ধরে। এছাড়া সার্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির তথ্যগুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
সূত্র জানায়, মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণ নবায়নে ছাড় রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ নবায়ন করা হচ্ছে। যা আওয়ামী লীগ আমলে শুরু হয়েছিল। খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কমাতে এই ছাড় দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কমছে না। উলটো আরও বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ নবায়নের পরও মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ নবায়নের হিড়িক পড়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় নবায়ন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালে এক বছরে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। ২০২৪ সালে বিশেষ ছাড়ে নবায়ন করা হয়েছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ নবায়ন বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ৯৯ শতাংশ। বিশেষ করে কিছু বড় শিল্প গ্রুপগুলো খেলাপি হয়ে পড়ায় তারা বিশেষ ঋণ নবায়ন করেছে। এছাড়া ব্যবসা সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ ছাড় দেওয়ায়ও ঋণ নবায়ন বেড়েছে। যে কারণে ওই বছরে খেলাপি ঋণ নবায়নের হার বেড়েছে। কিন্তু এসব খেলাপি ঋণ নবায়ন হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি কিস্তিও দেওয়া হয় না। পরে আবার খেলাপি হচ্ছে।
২০২৩ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন কমেছিল ৫ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। ২০২২ সালে খেলাপি ঋণ নবায়নের পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন বেড়েছিল ২৭ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২১ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে খেলাপি ঋণ নবায়ন বেড়েছিল ৩৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ছিল ১৩৮ শতাংশ।
আলোচ্য পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। এদিকে ঋণ নবায়নে বিগত সরকারের দিক থেকেও ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ ছিল। কারণ যেভাবেই হোক খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। খেলাপি ঋণ না কমালে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে পড়ছিল।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ার পর এসব ঋণের বড় একটি অংশ পুনরায় খেলাপি হচ্ছে। ২০২১ সালে নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছিল ৩২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট নবায়ন করা ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ খেলাপি হয়েছিল। ২০২২ সালে নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার ঋণ পুনরায় খেলাপি হয়েছিল। যা মোট নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২৩ সালে নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফের খেলাপি হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬০ কোটি টাকা। মোট স্থিতির ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
এরপর থেকে খেলাপি ঋণ নবায়নের স্থিতি যেমন বাড়ছিল, তেমনি নবায়ন করা ঋণ থেকে খেলাপি হওয়ার হারও বাড়ছিল। ২০২৪ সালে নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। স্থিতির ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ ঋণ ফের খেলাপি হয়েছিল। ২০২৫ সালে নবায়ন করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফের খেলাপি হয়েছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। যা মোট স্থিতির ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ নববায়ন হয়েছে শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, শিল্পের চলতি মূলধন খাতে ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ, আমদানি খাতে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণের মধ্যে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নির্মাণ খাতের ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ, অন্যান্য খাতে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ৩ দশমিক ০১ শতাংশ খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে।
ওই বছরে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ নবায়ন হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকগুলোতে ২৩ দশমিক ২৭ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ২ দশমিক ২১ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোতে দশমিক ৩৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় অঙ্কের ঋণ সবচেয়ে বেশি খেলাপি হয়েছে। নবায়নও করা হয়েছে বেশি এসব ঋণ। বড় অঙ্কের ঋণ নববায়ন করা হয়েছে ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, মাঝারি ঋণ ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ছোট অঙ্কের ঋণ ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, অতি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ঋণ ১ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতের ঋণ ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ নবায়ন করা হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



