ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটির ঘোষণা এসেছে। এই ছুটিকে ঘিরে যেমন কর্মজীবী ও ব্যবসায়ী মহলে নানা আলোচনা চলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও ছুটির আমেজ বিরাজ করছে। তবে এমন দীর্ঘ ছুটি দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে স্পষ্ট করেছেন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
গতকাল বুধবার (৪ জুন) রাজধানীর সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। দেশজুড়ে যখন দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে সংশয় ও জল্পনা-কল্পনা চলছে, তখন তার এই বক্তব্য অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের মনোভাব স্পষ্ট করেছে।
১০ দিনের টানা ছুটি, শুরু বৃহস্পতিবার
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আগামী বৃহস্পতিবার, ৫ জুন থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের সরকারি ছুটি। চলবে টানা ১০ দিন। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ঈদের ছুটি ছাড়াও শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি, শব-ই-কদর এবং ঈদের পরদিন ঐচ্ছিক ছুটি—সব মিলিয়ে এই দীর্ঘ বিরতিকে ‘সাময়িক অচলাবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে। তবে অর্থ উপদেষ্টার ভাষ্যে সেই শঙ্কার নিরসন ঘটেছে।
অর্থনীতিতে প্রভাব নেই—কেন?
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “ছুটি দীর্ঘ হলেও এটি পূর্ব পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকতার অংশ। এর ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে বা থেমে যাবে—এমন নয়। উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমের স্বাভাবিক ধারা রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ঈদুল আজহার সময় সাধারণত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কিছুটা ভিন্ন মাত্রার গতি দেখা যায়। পশু কেনাবেচা, পোশাক, খাদ্যদ্রব্য, যাতায়াতসহ অনেক খাতেই ব্যয়ের প্রবাহ বাড়ে। এটি এক ধরনের ‘ঈদ অর্থনীতি’ তৈরি করে, যা বাজারকে চাঙা রাখে।”
অর্থ উপদেষ্টার মতে, “টানা ছুটির কারণে অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে বন্ধ হয় না। খুচরা বাজার, পশুর হাট, পরিবহন, পর্যটনসহ অনেক খাতে তখন অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। বরং এটি অভ্যন্তরীণ ভোক্তা ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে সাময়িক উদ্দীপনা তৈরি করে।”
বাজেট প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা হবে ঈদের পর
এই সময়ই দেশের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ। বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক মহল—সবাই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব প্রতিক্রিয়ায় সরকার এখনই চূড়ান্ত অবস্থান নিচ্ছে না।
ড. সালেহউদ্দিন জানান, “বাজেট নিয়ে যেসব মন্তব্য আসছে, সেগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। তবে ঈদের কারণে এখন এগুলো বিশ্লেষণ করার সময়সীমা কিছুটা পেছাচ্ছে। ঈদের ছুটি শেষে সব মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা হবে। এর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, “আগামী ২২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হবে। তার আগে সম্ভাব্য সংশোধনী ও সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।”
ছুটি মানেই থেমে থাকা নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটি অর্থনৈতিক গতি থামিয়ে দেয় না, বরং খাতভেদে নতুন গতি তৈরি করে। ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশু ব্যবসা, খাদ্য সরবরাহ চেইন, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, পশুবাহি পরিবহন, বরফকল, শ্রমিকদের মজুরি খাত, প্যাকেজিং শিল্প, হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং গার্মেন্টসের বোনাস বিতরণ—সব মিলে একটি আলাদা আর্থিক মহাযজ্ঞ তৈরি হয়। ছুটি থাকা সত্ত্বেও এসব কর্মকাণ্ডে অর্থ প্রবাহ অব্যাহত থাকে।
তাছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ ঈদকেন্দ্রিক সময়ে আরও বেড়ে যায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টাকায় সরবরাহ বাড়ায়। এই সময়ে পর্যটন খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবাহ দেখা যায়।
ঈদের আনন্দেও সচল থাকবে অর্থনীতি
সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, ঈদুল আজহার টানা ছুটি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করবে—এমন আশঙ্কা ভিত্তিহীন। বরং অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ব্যাখ্যায় বোঝা যায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাময়িক পরিবর্তন আসলেও, সেটি ক্ষতিকর নয় বরং ভিন্ন খাতে কার্যকর গতি তৈরি করে।
পরিকল্পিত ছুটি এবং খাতভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি সচল থাকবে—এই আশাবাদই দিচ্ছেন দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা। তাই ঈদের ছুটিতে আনন্দ করুন, আর ভয়ের কোনো কারণ নেই—বাংলাদেশের অর্থনীতি নিজের গতিতেই চলবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



