ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামের সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যু।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরো সাত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃতশিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১১। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়া শিশু মারা গেছে আরো ৯০ জন। সব মিলিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৬০১ জনে পৌঁছেছে।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরো এক হাজার ২১০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। একই সময় ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং নতুন করে এক হাজার ৫২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৭৪ হাজার ৫৭২ জনের।
এর মধ্যে ৯ হাজার ১৯১ জনের শরীরে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬০ হাজার ১৫৮ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৫৫ হাজার ৯৪২ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহযোগিতায় দেশে হামের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল।
২০১৭ সালে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর নজির আগে দেখা যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে এর আগে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে। সে বছর আক্রান্ত হয়েছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। গত বছর ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭।
প্রতি ছয় রোগীর একজন প্রাপ্তবয়স্ক : হামের সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে রাজধানীর ডিএনসিসি কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিয়েছে ছয় হাজার ৯৩৪ জন রোগী। মারা গেছে ৪১ জন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ৩২৮ জন।
হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া পাঁচ হাজার ৮১১ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চিকিৎসা নেওয়া প্রতি ছয়জন রোগীর একজনের বয়স ১৫ বছরের বেশি। অর্থাৎ হামের সংক্রমণ শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্কও আক্রান্ত হচ্ছেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছয় মাসের কম বয়সী রোগী ছিল ৩৫৯ জন (৬.১৭ শতাংশ), সাত থেকে ৯ মাস বয়সী ৬৯৪ জন (১১.৯৪ শতাংশ), ১০ মাস থেকে দুই বছর বয়সী এক হাজার ৪৭১ জন (২৫.৩১ শতাংশ), দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক হাজার ১৯৪ জন (২০.৫৪ শতাংশ), পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী ৭৬৮ জন (১৩.২১ শতাংশ) এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪১৭ জন (৭.১৭ শতাংশ)।
অন্যদিকে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগী ছিল ৫৮৪ জন (১০.০৫ শতাংশ) এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী রোগী ছিলেন ৩২৪ জন (৫.৫৭ শতাংশ)। অর্থাৎ ১৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীর সংখ্যা মোট রোগীর প্রায় ১৫.৬ শতাংশ, যা প্রতি ছয়জনে একজন।
গতকাল ডিএনসিসি হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ৪২ জন প্রাপ্তবয়স্ক হাম রোগী ভর্তি রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে আইসিইউতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বান্দরবানের লামা থেকে আসা ৩৫ বছর বয়সী হাসান মাহমুদ সুমন তাঁদেরই একজন। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে রোগটি তাঁকে গুরুতর অসুস্থ করে তোলে। স্থানীয় চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখনো তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে পরিবার।
কেন আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রা : ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, পরিবারের আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে যথাযথভাবে আইসোলেশনে না রাখলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে।
তিনি বলেন, অনেকের ধারণা, হাম শুধু শিশুদের রোগ। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। যাঁরা শৈশবে টিকা নেননি, পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেননি, আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি কিংবা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়া রোগী, কিডনি ডায়ালিসিসে থাকা ব্যক্তি, যক্ষ্মা রোগী কিংবা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড গ্রহণকারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাঁরা সহজেই হামে আক্রান্ত হতে পারেন।
তাঁর মতে, বড়দের তুলনায় শিশুরাই হামের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে এবং মৃত্যুঝুঁকিও তাদের বেশি। এ কারণেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে প্রাপ্তবয়স্করাও শিশুদের মতো আক্রান্ত হতে পারেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা চিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



