ছবি: সংগৃহীত
** অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হবে
** ২০২৮-২৯ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ বা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হতে পারে
** জুলাই যোদ্ধা, নারী, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখা হতে পারে
আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা করছে সরকার। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখে অন্তবর্তীকালীন সরকারের দেওয়া ঘোষণা বর্তমান সরকার বহাল রাখার কথা চিন্তা করছে। শুধু এই দুই অর্থবছর নয়, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমাও আগামী অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। তবে জুলাই যোদ্ধা, নারী, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখা হতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা গত তিন অর্থবছর ধরে বহাল রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অন্তবর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী দুই অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা মাত্র ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে। সীমা বাড়ানোর ফলে কিছু করদাতা হারাতে পারে এনবিআর। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্টরা করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকার বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছর ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে বহু করদাতা করনেট থেকে বের হয়ে যাবে-এই ভেবে ২০২৫-২৬ বা চলতি অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়ানো হয়নি। চলতি অর্থবছর ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা বহাল রাখা ছাড়াও নারী ও ৬৫ বছর তদূর্ধ্ব করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা বহাল রাখা হয়। ২০২৩-২৪ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়। সেই থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই সীমা বাড়ানো হয়নি। অর্থাৎ ৩ করবর্ষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বহাল রয়েছে। তবে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে অন্তবর্তীকালীন সরকার আগামী অর্থবছর বা ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮-এই দুই অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, সীমিত আয়ের মানুষের করের বোঝা হ্রাস করা, সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে আগামী দুই অর্থবছর বা করবর্ষের জন্য সীমা মাত্র ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সেই সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার বহাল রাখার পরিকল্পনা করছে। তবে বর্তমান সরকার ২০২৮-২৯ অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছর ৪ লাখ ৫০ বা ৭৫ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা করছে, যা ১১ জুন বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করবে সরকার। পে-স্কেল ঘোষণার পর মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে, যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সেজন্য কম আয়ের করদাতাদের স্বস্তি দিতে এই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, অন্তবর্তীকালীন সরকার ‘জুলাই যোদ্ধা’ যারা, সেই সব করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয় নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত করদাতাদের জন্য বিশেষ সম্মান ও স্বীকৃতিস্বরূপ একটি নতুন শ্রেণি গঠন করা হয়েছে। এই ‘জুলাই যোদ্ধা’ করদাতাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছর জুলাই যোদ্ধাদের জন্য এই করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখার পরিকল্পনা করছে। দেশে কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে যেকোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ‘কৃষি হইতে আয়’ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখা হয়েছে, যা বহাল রাখা হতে পারে। বিগত সরকার বেসরকারি চাকরিজীবীদের করযোগ্য আয় পরিগণনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বাদযোগ্য অঙ্কের (যা করমুক্ত সুবিধা পায়) পরিমাণ সাড়ে ৪ লাখ টাকা হতে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করেছে, যা আগামী অর্থবছর বহাল রাখা হতে পারে। চাকরিজীবী কর্মচারীদের কিডনি, লিভার, ক্যান্সার, হার্ট-এর চিকিৎসার পাশাপাশি মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ও কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রাপ্ত অর্থকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী অর্থবছর বহাল রাখা হতে পারে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আয়, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বজনীন পেনশন স্কিম হতে প্রাপ্ত সুবিধাভোগীর যেকোনো আয় এবং জিরো কুপন ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট হতে উদ্ভূত আয়কে করমুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী অর্থবছর বহাল রাখা হতে পারে।
অপরদিকে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগণের ওপর করের চাপ কমাতে করমুক্ত আয়সীমা কমানোর প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই। সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআইয়ের যৌথ পরামর্শক সভায় এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর আগে এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় ডিসিসিআই করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা করসীমার মধ্যে থাকা সীমিত আয়ের করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আর এমসিসিআই করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। আর দেশের প্রধান বিরোধী দল সম্প্রতি বাজেট বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় করমুক্ত আয়সীমা ৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছে।
এই বিষয়ে এনবিআরের বাজেট সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। যার ফলে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত। সেজন্য এনবিআর করমুক্ত আয়সীমা নতুন করে বাড়াবে না, শুধু অন্তবর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা বাস্তবায়ন করবে। এতে কয়েক লাখ করদাতা এনবিআর হারাতে পারে। আবার কিছু নতুন করদাতা পাবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



