ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের অনেক দেশে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের নতুন এক বৈশ্বিক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০০২ সাল থেকে পরিচালিত জরিপের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেল।
পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের ইতিবাচক ধারণা আগের তুলনায় আরো কমেছে। জরিপে আরো দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং—দুজনের প্রতিই মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে কম।
তবে বেশির ভাগ দেশে ট্রাম্পের চেয়ে শি চিনপিংয়ের ওপর কিছুটা বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। গবেষণার জন্য চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে খুব ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক নাকি খুব নেতিবাচকভাবে দেখেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি।
মাত্র ছয়টি দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। দেশগুলো হলো পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরায়েল। এগুলোর বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেন, ২০০২ সাল থেকে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় শক্তিধর দেশগুলো সম্পর্কে মানুষের মতামত নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে।
তিনি জানান, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের শেষ দিকে এবং ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে তখনও চীনের ভাবমূর্তি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম ছিল। এবারের জরিপে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও কানাডায়। এ ছাড়া ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষ সাধারণভাবে চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখেন। অন্যদিকে ধনী দেশগুলোতে চীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তুলনামূলক বেশি।
তবে এই প্রবণতার একটি ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে জরিপে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর শীর্ষে থাকলেও দেশটিতে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব শক্তিশালী। জরিপে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মত এসেছে পাকিস্তান থেকে। সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ইতিবাচক মত এসেছে জাপান থেকে। সেখানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছে আরো জানতে চাওয়া হয়, বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি চিনপিংয়ের ওপর কতটা আস্থা রাখেন। ফলাফলে দেখা যায়, দুই নেতার প্রতিই আস্থার হার বেশির ভাগ দেশে ৫০ শতাংশের নিচে। তবে অনেক দেশেই ট্রাম্পের তুলনায় শি চিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি। শি চিনপিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা দেখা গেছে পাকিস্তানে। সেখানে ৮৩ শতাংশ মানুষ তার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে জাপানে। সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ শির ওপর আস্থা রাখেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন ফিলিপাইনের মানুষ। সেখানে তার প্রতি আস্থার হার ৬৮ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে। সেখানে মাত্র চার শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেন, শি চিনপিংকে নিয়ে মানুষের মতামত সাধারণত খুব শক্ত অবস্থানের হয় না। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মানুষ অনেক বেশি স্পষ্ট ও চরম অবস্থান থেকে মতামত দিয়েছেন।
জরিপে দেখা গেছে, এখনো বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজেদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি সম্মান করে। তবে আগের তুলনায় এই ব্যবধান কমে এসেছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশে করা অতিরিক্ত জরিপে ৭৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনেক বেশি হস্তক্ষেপ করে। একই প্রশ্নে চীনের ক্ষেত্রে এই মত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ জানিয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে চীন প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। গত দুই দশকের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
তবে এশিয়া সোসাইটির আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময় চীনের যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা এখন পর্যন্ত সীমিত পরিসরে উন্নতি করেছে। কার্নেগি চায়নার গবেষক ড. চং জা ইয়ান বলেন, পিউর সর্বশেষ ফল তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ফলে অনেক দেশের মানুষ চীনকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চীন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর প্রভাবও এখন দেখা যাচ্ছে। তবে ড. চং মনে করেন, চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা বাড়লেও শি চিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা তুলনামূলক কম থাকার কারণও রয়েছে।
তার ভাষায়, অনেক মানুষ চীনকে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা শি চিনপিংকে একজন শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী নেতা বলেও মনে করেন। তিনি আরো বলেন, শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান অন্য দেশগুলোর ওপরও জোর দিয়ে তুলে ধরছে। এ ছাড়া দেশটিতে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও তাদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, অনেক মানুষ প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মতো ইতিবাচক বিষয়গুলো চীনের সাফল্য হিসেবে দেখেন। তবে কঠোর নীতি ও চাপ সৃষ্টি করা সিদ্ধান্তগুলোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে শি চিনপিংকেই দায়ী করেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



