ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই জটিল হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের একটি নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করলে বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হতে পারে। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠককে সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এলডিসি-পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যেই নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। তারা বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন, যাতে বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়া হয়।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস আগামী নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল যৌথভাবে জাতিসংঘের কাছে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণ স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে। এখন সেই সুপারিশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর সরাসরি পড়বে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান দুটি রপ্তানি বাজার—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলো যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। কারণ এলডিসি সুবিধা হারানোর পর বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বড় একটি অংশ হারাবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি) নিয়ে তদন্ত করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি বাস্তবায়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হওয়ায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বগতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারালে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক ব্যবস্থাগুলো (ইন্টারন্যাশনাল সাপোর্ট মেজারস বা আইএসএম) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে রপ্তানি খাত এবং ওষুধশিল্প এসব সুবিধার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা হারিয়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, প্রতিযোগিতা কমবে এবং রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর মূল্যায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা। ফলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ ঘটলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারানোর ক্ষতি কমাতে বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদার দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সম্পন্ন করাও জরুরি। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন আরও বলছে, মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত ছাড় (আইপিআর ওয়েভার) শেষ হয়ে গেলে দেশের ওষুধশিল্পও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দারিদ্র্য বাড়ছে। ফলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে গেলে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
সরকারের মতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এসব সুবিধা হারালে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং টেকসই ও নির্বিঘ্ন এলডিসি উত্তরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগের পাঁচ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বছরে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। কিন্তু এরপর থেকে সেই প্রবৃদ্ধির গতি কমে এসেছে। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালে দারিদ্র্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে, যার ফলে আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের পেছনে ব্যয় হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তেলের আমদানি ব্যয় ৭২ শতাংশ এবং সারের আমদানি ব্যয় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আমদানি ব্যয় মেটানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ বিতরণ ও নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণের সুদ এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য উন্নয়ন খাতে সরকারি বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সরকার আরও বলেছে, শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা এখনও বহাল থাকলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, দেশের উচ্চ সুদের হার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমার আগে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করা, রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণের জন্য সরকারের অন্তত আরও দুই বছর সময় প্রয়োজন। সেই কারণেই বাংলাদেশ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



