ছবি: সংগৃহীত
কর-জিডিপি (ট্যাক্স-টু-জিডিপি) অনুপাতে বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজস্ব ভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সংস্কার কর্মসূচি এবং কৌশলগত উদ্যোগগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে এনবিআর।
বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল অংশ নেন। নতুন বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো এই আলোচনায় মূল অগ্রাধিকার পায়।
তলানিতে কর-জিডিপি অনুপাত: আইএমএফের উদ্বেগ
আইএমএফের ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
- লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তবতা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৯.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, বাস্তবে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রায় ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
- আইএমএফের চাওয়া: সংস্থাটি কেবল কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা দেখতে চায় না, বরং মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের কার্যকর ও কৌশলগত উদ্যোগের বাস্তব প্রমাণ দেখতে আগ্রহী।
রাজস্ব বাড়াতে এনবিআরের ৪ মূল কৌশল
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সামনে এনবিআর বর্তমান অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এনবিআর মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর জোর দিচ্ছে:
১. পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন: কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা, যাতে করদাতারা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি ছাড়াই সহজে কর দিতে পারেন এবং কর ফাঁকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়। ২. করজাল সম্প্রসারণ (Tax Net Expansion): প্রথাগত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে দেশের নতুন নতুন এলাকা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনা। ৩. কর ফাঁকি রোধ: কঠোর অডিট ও আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় বড় কর ফাঁকির উৎসগুলো বন্ধ করা। ৪. বকেয়া রাজস্ব আদায়: বিভিন্ন আইনি জটিলতা বা আপিল প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা বিশাল অঙ্কের বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায়ের জন্য বিশেষ সেল গঠন ও তদারকি জোরদার করা।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
রাজস্ব খাতের এই সংস্কার ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও কর বিশ্লেষকেরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
মাশরুর রিয়াজ (চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ): "আমাদের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসা এবং প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা—এই দুটি বিষয়কে একসঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে। অর্থনীতি যদি সংকুচিত হয়ে পড়ে বা প্রবৃদ্ধির গতি ব্যাহত হয়, তবে কর আদায়ের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে টেকসই রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সচল রাখা জরুরি।"
স্নেহাশীষ বড়ুয়া (আয়কর বিশ্লেষক): "শুধুমাত্র নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, প্রতি মাসের মনিটরিং ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। একটি সহজ হিসাব হলো—বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) যদি ৩ লাখ কোটি টাকা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় এবং সেখান থেকে ১৫ শতাংশ হারে কর ও ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করা যায়, তবে কেবল এই একটি খাত থেকেই অনায়াসে ৪৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব চলে আসবে।"
সামনের চ্যালেঞ্জ
আইএমএফের নতুন ঋণের কিস্তি ছাড় পাওয়া এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অনেকটাই নির্ভর করছে এই কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির ওপর। এনবিআর আইএমএফকে যে আশ্বাসের রূপরেখা দিয়েছে, তা বাস্তবে কতটা রূপ নেয় এবং করদাতাদের হয়রানি না বাড়িয়ে কীভাবে করের আওতা বাড়ানো সম্ভব হয়—সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



