ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক বিশাল বিপর্যয় নেমে এসেছে। সরকারের নেওয়া নানা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ইতিহাসের অন্যতম বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে সংস্থাটির রাজস্ব সংগ্রহে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তব চিত্র: ৮১.৬ শতাংশে থমকে গেল অর্জন
সংসদে উপস্থাপিত অর্থমন্ত্রীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, বছর শেষে সংস্থাটি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ। সার্বিকভাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা—যা প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার সমান।
তবে এই বিশাল ঘাটতির মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো প্রবৃদ্ধির ধারা সচল থাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে এনবিআর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা, সেখানে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আদায় বেড়েছে ১১ শতাংশ বা ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। তবে এই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার আকাশচুম্বী চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে সব খাতেই চরম ধস
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি খাতেই এই ঘাটতির চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক। কোনো খাতই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি:
- আয়কর খাত: সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আয়কর খাতে। এই খাতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার মাত্র ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
- মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত: অভ্যন্তরীণ রাজস্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ভ্যাট খাতেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ১ লাখ ৮৬ Dust ১১০ কোটি টাকার সমপরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
- শুল্ক খাত: আমদানি-রপ্তানি শুল্ক খাতে ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। এই খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন ও আগামী অর্থবছরের বিশাল চ্যালেঞ্জ
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রথমে ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় তা আরও বাড়িয়ে সংশোধনপূর্বক ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
অন্যদিকে, সংশোধিত বাজেটে এনবিআর এবং এনবিআর-বহির্ভূত খাতসহ সরকারের মোট রাজস্বের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আদায় পরিস্থিতির মন্দাভাবের কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এনবিআর-বহির্ভূত বিভিন্ন খাত থেকে গত মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারের ঘরে এসেছে মাত্র ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চলতি নতুন অর্থবছরে এনবিআরকে আরও বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের এক অতি-উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, যা অর্জন করা বর্তমান বাস্তবতায় এনবিআরের জন্য এক পর্বতসমান চ্যালেঞ্জ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে ডিজিটাল উদ্যোগ
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সংসদে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ভ্যাট-সংক্রান্ত হয়রানি বন্ধ এবং ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়িত আইনি ও প্রযুক্তিগত সংস্কারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ভ্যাট-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আইনগত ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ব্যাপক আমূল পরিবর্তন এনেছে। গৃহীত মূল পদক্ষেপগুলো হলো:
- ইনস্ট্যান্ট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন: ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে আইন সংশোধন করে তাৎক্ষণিক ভ্যাট নিবন্ধন বা 'ইনস্ট্যান্ট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন' চালু করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের বিলম্ব বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানি ছাড়াই দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন পাচ্ছেন।
- অনলাইন রিটার্ন দাখিল: শতভাগ অনলাইন রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার শেষ করা হয়েছে।
- শতভাগ ইলেকট্রনিক সংরক্ষণ: এনবিআর নির্ধারিত বিশেষায়িত মূসক সফটওয়্যার বা ইআরপি (ERP) ব্যবস্থার মাধ্যমে সব ধরনের ব্যবসায়িক দলিল শতভাগ ইলেকট্রনিক উপায়ে সংরক্ষণের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
- ই-চালান ও এ-চালান: ব্যবসায়ীরা যাতে ঘরে বসেই সহজে এবং নিরাপদে কর পরিশোধ করতে পারেন, সে জন্য ই-চালান ও এ-চালানের মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়াটিকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এনবিআরের ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা
ভ্যাট ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও কাগজবিহীন করতে ভবিষ্যতে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংসদে জানান অর্থমন্ত্রী। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. স্বয়ংক্রিয় ই-ইনভয়েসিং: কর ফাঁকি রোধ এবং ব্যবসায়িক লেনদেন স্বচ্ছ করতে দ্রুতই স্বয়ংক্রিয় ই-ইনভয়েসিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। ২. এপিআই সিস্টেম প্রবর্তন: ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ইআরপি ডেটা সরাসরি এনবিআরের সিস্টেমে সংগ্রহের জন্য এপিআই (API) সংযোগ স্থাপন করা হবে। ৩. সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ: এনবিআরের অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের ডাটাবেজকে একটি সমন্বিত ইলেকট্রনিক সিস্টেমে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিকায়ন: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজতর করতে এবং শুল্কায়নে গতি আনতে এনবিআর ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসংযোগ বৃদ্ধি এবং ‘ইলেকট্রনিক ইন্টারন্যাশনাল ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম’ প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে বিশাল ভ্যাট ছাড়
স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের বিকাশ এবং দেশকে "ডিজিটাল বাংলাদেশ" থেকে "স্মার্ট বাংলাদেশে" রূপান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে বড় ধরনের কর ছাড়ের ঘোষণা বহাল রেখেছে সরকার।
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশীয় হার্ডওয়্যার শিল্পের সুরক্ষায় কম্পিউটারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য—যেমন ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার, কার্টিজ, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, মাউস, র্যাম ও মাদারবোর্ডের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশীয় শিল্পকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে এই ভ্যাট ছাড়ের মেয়াদ আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। সরকারের এই নীতিগত সহায়তার ফলে স্থানীয় প্রযুক্তি উৎপাদন খাত আরও বিকশিত হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



