ছবি: সংগৃহীত
টানা পরাজয়ের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অবশেষে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় খেলায় টাইগাররা দারুণ ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সমন্বয়ে ৮৩ রানের বিশাল জয় তুলে নিয়ে সিরিজে ১-১ ব্যবধানে সমতা ফিরিয়েছে। লিটন দাসের নেতৃত্বে খেলতে নামা বাংলাদেশ দল প্রথম ম্যাচে হারের চাপ কাটিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে যা করল, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বুধবার (১৬ জুলাই) সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচ এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ফাইনালসদৃশ লড়াই।
এর আগে ওয়ানডে সিরিজেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সেখানেও প্রথম ম্যাচে হারের পর দ্বিতীয়টিতে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচে হার মানায় ২-১ ব্যবধানে সিরিজটি হাতছাড়া করতে হয়। এবার সেই ভুল আর করতে চায় না টাইগাররা। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোয় দলের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে—সেই ছাপ ছিল স্পষ্ট।
রোববার (১৪ জুলাই) শ্রীলঙ্কার রাঙ্গিরি ডাম্বুলা স্টেডিয়ামে টস হেরে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ওপেনার সৌম্য সরকার (৫) এবং দ্বিতীয় ম্যাচে সুযোগ পাওয়া তানজিদ হাসান তামিম (০) সাজঘরে ফেরত যান। স্কোরবোর্ডে তখন মাত্র ৭ রান।
এ অবস্থায় দলের হাল ধরেন তাওহিদ হৃদয় ও লিটন কুমার দাস। চাপের মুখে তাঁরা গড়ে তোলেন ৫৫ বলে ৬৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তাদের এই জুটি ম্যাচের গতি বদলে দেয়। লিটন এরপর আরও একটি মূল্যবান জুটি গড়েন শামীম হোসেন পাটোয়ারীর সঙ্গে। দুজনে ৩৯ বলে ৭৭ রান যোগ করে দলের স্কোরবোর্ডে বড় পুঁজি যোগ করেন।
লিটন কুমার দাস ৫০ বল মোকাবিলা করে ১টি চার ও ৫টি বিশাল ছক্কার সাহায্যে ৭৬ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলে সাজঘরে ফেরেন। অপরদিকে ইনিংসের শেষভাগে ঝড় তোলেন শামীম। মাত্র ২৭ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কার সাহায্যে ৪৮ রান করে রানআউট হয়ে ফেরেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। তাওহিদ হৃদয় করেন ২৫ বলে ৩১ রান।
সবমিলিয়ে ২০ ওভারে ৭ উইকেটে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ১৭৭ রানের লড়াকু স্কোর। এই সংগ্রহের পেছনে লিটন, শামীম ও হৃদয়ের দারুণ ইনিংসের পাশাপাশি মিডল অর্ডারে কয়েকটি ছোট ইনিংসও সহায়ক হয়।
১৭৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। প্রথম পাঁচ ওভারে দুই ওপেনার ও মিডল অর্ডারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি। সেই চাপ থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা।
লঙ্কানদের ব্যাটিং লাইনআপকে ধসিয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনজন বোলার—রিশাদ হোসেন, শরিফুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন।
লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন ৩.২ ওভারে মাত্র ১৮ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন। বিশেষ করে তার গুগলি ও ফ্লিপার ভীষণ বিভ্রান্ত করেছে শ্রীলঙ্কার মিডল অর্ডার ব্যাটারদের। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম ৩ ওভারে ১২ রান দিয়ে তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ ২টি উইকেট। একই সংখ্যক উইকেট পান পেসার সাইফউদ্দিনও, যিনি ৩ ওভারে মাত্র ২১ রান খরচ করেন।
শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ইনিংস থামে মাত্র ১৫.২ ওভারে ৯৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে হারের শঙ্কা নিয়ে শুরু করা ম্যাচটি জিতে যায় বিশাল ব্যবধানে—৮৩ রানে। এটি বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের অন্যতম বড় জয়।
এ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত ধসে পড়ে। দলের হয়ে দুই অঙ্কে পৌঁছানো ব্যাটার ছিলেন মাত্র দুইজন—ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা ও সাবেক অধিনায়ক দাসুন শানাকা। নিশাঙ্কা করেন ৩২ রান, শানাকা ২০ রান। বাকিরা কেউই বলার মতো সংগ্রহ করতে পারেননি। কেউ ১০ রানও করতে পারেননি।
এতে বোঝা যায়, বোলারদের পাশাপাশি ফিল্ডারদের কৃতিত্বও ছিল অসাধারণ। রিশাদের ক্যাচ, শরিফুলের নিয়ন্ত্রিত ইয়র্কার, হৃদয়ের ফ্লিক থ্রো—সব মিলিয়ে ম্যাচে পূর্ণতা পায় টাইগারদের সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা।
প্রথম ম্যাচে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে এত বড় ব্যবধানে জয় নিঃসন্দেহে দলের জন্য ইতিবাচক বার্তা। লিটন দাসের নেতৃত্বে দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
ম্যাচশেষে অধিনায়ক লিটন দাস বলেন, “প্রথম ম্যাচে ভুল ছিল অনেক। আজ আমরা পরিকল্পনামতো খেলেছি। এটা দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্সের জয়।”
অন্যদিকে, ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়া রিশাদ হোসেন বলেন, “আমি শুরু থেকেই জানতাম, লঙ্কানরা স্পিনে দুর্বল। কোচ-অধিনায়ক সাহস দিয়েছিলেন, আমি শুধু আমার পরিকল্পনা ঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছি।”
তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ এখন ১-১ সমতায়। বুধবার (১৬ জুলাই) রাঙ্গিরি ডাম্বুলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ। এই ম্যাচই নির্ধারণ করবে, কার হাতে উঠবে সিরিজের ট্রফি।
দুই দলই এই ম্যাচকে ঘিরে আলাদা পরিকল্পনা নিচ্ছে। বাংলাদেশ চাইবে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে, আর শ্রীলঙ্কা চাইবে হঠাৎ ফিরে এসে জয় ছিনিয়ে নিতে।
বাংলাদেশের জন্য এ জয় শুধু সিরিজে সমতায় ফেরার নয়, বরং আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জয়। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই একাত্ম হয়ে খেলার বার্তা দিয়েছে টাইগাররা। তাওহিদ হৃদয়ের ধৈর্য, লিটনের ক্লাস, শামীমের আগ্রাসন আর রিশাদ-শরিফুল-সাইফউদ্দিনের নিখুঁত বোলিং—সবকিছুই মিলেমিশে তৈরি করেছে একটি পারফেক্ট ম্যাচ।
এখন অপেক্ষা বুধবারের ‘অঘোষিত ফাইনাল’-এর, যেখানে জয় পেলে শুধুই সিরিজ নয়—পাবে সমালোচনার জবাবও। টাইগারদের সেই আত্মবিশ্বাস ও মনোভাবই হয়তো গড়ে দেবে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



