ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বড় ধরনের অপরাধের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই সংবাদের ফলে অনেক নাগরিকের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বাধীন দপ্তর থেকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
সোমবার (১৪ জুলাই) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এক লিখিত বিবৃতি দিয়ে স্পষ্টভাবে জানানো হয়—চলতি বছরে দেশে বড় ধরনের সহিংস ও গুরুতর অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—এমন দাবি বাস্তবভিত্তিক নয় এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী তা সঠিকও নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়কালীন সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বড় ধরনের অপরাধের প্রবণতা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ‘অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে’—এমন প্রতিবেদনগুলো জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।”
প্রেস উইং জানায়, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিগত ১০ মাসে ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, সন্ত্রাসী হামলা, খুন, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার ক্রাইম, মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক সহিংসতা—এই সবগুলো অপরাধধরনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের মধ্যে অধিকাংশ অপরাধের হার হয়তো কিছু ক্ষেত্রে ওঠানামা করেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে গুরুতর অপরাধের পরিমাণ বাড়ার কোনো সুস্পষ্ট চিত্র নেই।
বিশেষ করে ডাটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতা, দাঙ্গা ও নাশকতার মতো অপরাধ কমেছে। সাইবার অপরাধ ও অর্থনৈতিক অপরাধে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেলেও তা এখনো ‘নিয়ন্ত্রণসীমার মধ্যে’ রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেছে।
প্রেস উইং বলেছে, “গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু অপরাধসংক্রান্ত সংবাদ যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাতে পুরো দেশের চিত্র ভুলভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। পৃথক কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক অপরাধচিত্র আঁকার চেষ্টা ভুল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অপরাধের প্রকৃতি এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিচ্ছিন্নভাবে ঘটলেও তা সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে—এমন প্রবণতাও সৃষ্টি হয়েছে।”
সেই সঙ্গে প্রেস উইং সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছে, তারা যেন যাচাই-বাছাই করে তথ্য উপস্থাপন করে, যাতে জনসচেতনতা বাড়ে, কিন্তু অহেতুক আতঙ্ক বা ভুল বার্তা না ছড়ায়।
বিবৃতিতে নাগরিকদের উদ্দেশে বলা হয়, “অপরাধ যেহেতু সমাজেরই অংশ, সেহেতু এটি পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও তদন্তে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সকল নাগরিককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে হবে এবং অপরাধ দমনে তাদের প্রতি আস্থা রাখতে হবে।”
প্রেস উইং আরও বলেছে, “দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, দক্ষতা এবং প্রস্তুতি এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত। ডিজিটাল নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, অপরাধ বিশ্লেষণ এবং দ্রুত বিচারিক কার্যক্রমের ফলে অধিকাংশ গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
তথ্য অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট অপরাধ যেমন: ডিজিটাল প্রতারণা, অর্থ জালিয়াতি, পারিবারিক সহিংসতা ও কম বয়সী অপরাধীদের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধে সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করে চলেছে এবং স্বল্প সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গণমাধ্যমে একটি বা দুটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যতটা হইচই হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি অপরাধ প্রতিদিন প্রতিরোধ হচ্ছে, যার খবর হয়তো আসে না। পুরো অপরাধ পরিস্থিতিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার নিরিখে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।”
প্রেস উইং-এর বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো তাদের দায়িত্বে সম্পূর্ণ সচেতন। কোনো অতি-বর্ধিত অপরাধপ্রবণতা বা বড় ধরনের সহিংসতা সমাজে দেখা যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও রাজনীতির চালচিত্রে কোনো রকম ভয়াবহ নিরাপত্তা হুমকি নেই।”
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের অবিরাম চেষ্টা, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমাজের অংশগ্রহণ মিলেই পারে বাস্তব পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
প্রেস উইং-এর বিবৃতি মনে করিয়ে দেয়, পরিস্থিতি যতটা উদ্বেগজনক বলা হচ্ছে, বাস্তবতা ততটা ভয়াবহ নয়। বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অতএব, গুজব বা অতিরঞ্জিত তথ্যের বদলে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণই অপরাধ দমনে হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



