ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় দুই বছর ভারতে কাটানোর পর শেখ হাসিনার এই হঠাৎ ঘোষণা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল আলোড়ন ও জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
তার এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই সবার নজর এখন দিল্লির দিকে। শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান কী, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
রয়টার্স সাক্ষাৎকারে কী বললেন শেখ হাসিনা?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ ও দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই তার দেশে ফেরার এই সম্ভাব্য সময়সীমাটি স্পষ্ট করেছেন। দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী এই সাক্ষাৎকারে ভারতের একটি গোপন স্থানে অবস্থানরত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান:
-
স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন: আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
-
নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ফেরা: তিনি একা নন, দলের জ্যেষ্ঠ ও বিশ্বস্ত নেতাদের সঙ্গে নিয়েই দেশে পা রাখবেন।
-
আইনের মুখোমুখি হওয়া: দেশে ফিরে তিনি পালিয়ে বেড়াবেন না, বরং স্বেচ্ছায় আদালতের মুখোমুখি হবেন এবং আত্মসমর্পণ করবেন।
ভারতের মাটিতে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর এই প্রথম শেখ হাসিনা নিজের দেশে ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট এবং সম্ভাব্য সময়সীমা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন।
ভারতের প্রতিক্রিয়া: ‘আইনি প্রক্রিয়াই শেষ কথা’
শেখ হাসিনার এই নাটকীয় ঘোষণার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তার দেশে ফেরার ঘোষণা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "এই ব্যাপারে আমাদের পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি। যে কোনো ধরনের প্রত্যাবাসন বা প্রত্যর্পণ ইস্যু সম্পূর্ণ একটি আইনি বিষয়। পুরো বিষয়টি দুই দেশের বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া এবং চুক্তি অনুযায়ীই নিষ্পত্তি করা হবে।"
নয়াদিল্লির এই কূটনৈতিক ও পরিমিত মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্তকে ভারত সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেখছে, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতাকে বজায় রাখার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা।
পটভূমি: ক্ষমতাচ্যুতি থেকে দিল্লির গোপন আস্তানা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। সেদিনই সামরিক হেলিকপ্টারে করে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর থেকে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি সুরক্ষিত ও অত্যন্ত গোপন স্থানে অবস্থান করছেন।
ভারত সরকার শুরু থেকেই তাকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরদার হতে থাকে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের বিশেষ আদালতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি
শেখ হাসিনার এই দেশে ফেরার ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গুরুতর অপরাধের রায় ও পরোয়ানা রয়েছে, তাই তিনি বাংলাদেশে পা রাখা মাত্রই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর কোনো সুযোগ তার থাকবে না।
রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা
আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনার এই "স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের" ঘোষণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
| বিশ্লেষণযোগ্য দিক | সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব |
| আওয়ামী লীগের অবস্থান | শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে পারে, তবে আইনি জটিলতা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। |
| ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক | ভারতের এই "আইনি প্রক্রিয়া" অনুসরণের বার্তা ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি বড় প্রয়াস। |
| অভ্যন্তরীণ রাজনীতি | ডিসেম্বরের এই ঘোষিত সময়সীমাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন কোনো অস্থিরতা বা মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। |
আপাতত সবার চোখ আগামী ডিসেম্বরের দিকে। শেখ হাসিনা আসলেই কি দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ে নামবেন, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল—তা সময়ই বলে দেবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



