ছবি: সংগৃহীত
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বহুল আলোচিত নবম পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আজ বৈঠকে বসছে পুনর্গঠিত সচিব কমিটি। সকাল সাড়ে ৯টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় বৈঠকেই সচিব কমিটির প্রস্তাবিত সুপারিশমালা চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে। জানা গেছে, প্রথম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ ভাগ এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো কারণে যদি আজ এটি চূড়ান্ত করা সম্ভব না হয়, তবে পরবর্তী বৈঠকে তা চূড়ান্ত করে সরাসরি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই এই নতুন স্কেলের মূল বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হবে এবং সব ধরনের ভাতা আগামী অর্থবছরে দুই ধাপে পরিশোধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমানে চালু থাকা ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকার অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ ভাতাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, মূল বেতন এক লাফে দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বিশেষ ভাতার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকবে না।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল দেওয়ার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী। বর্তমান বাজারে জীবনযাত্রার যে ব্যয় বেড়েছে, তাতে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১৪০ শতাংশ এবং কর্মকর্তাদের জন্য ১০০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব অত্যন্ত যৌক্তিক। এটি না করলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান ধরে রাখা এবং প্রশাসনে সততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেত। তিনি জানান, বেতন বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির তেমন সম্পর্ক নেই। অস্টম পে-স্কেলে সেরকম কিছু দেখা যায়নি। তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর মূল বেতনের পুরো অংশ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকেই দেওয়া শুরু হবে। তবে সরকারের ওপর হঠাৎ বিশাল আর্থিক চাপ কমানোর জন্য ভাতাসংক্রান্ত অংশটি দুই ধাপে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী অর্থবছরে।
আইএমএফের চাপ ও সরকারের শক্ত অবস্থান : অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ সরকারকে সরকারি খাতের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে ভর্তুকি বা বরাদ্দ সীমিত রাখার জন্য পরোক্ষ চাপ দিয়ে আসছিল। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এবার কঠোর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আইএমএফের সেই পরামর্শকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে সম্মান করি, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রার যে আকাশচুম্বী ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, তা বিবেচনা না করে সরকারি কর্মচারীদের বঞ্চিত রাখা সম্ভব নয়। ১ জুলাই থেকেই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত ঘোষণা রয়েছে। আশা করছি এ বিষয়ে আইএমএফ দ্বিমত পোষণ করবে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সচিব কমিটির গভীর উদ্বেগ ও পর্যালোচনা : সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন একযোগে বৃদ্ধি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। আজকের বৈঠকের একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত পর্যালোচনা। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর একটি প্রবণতা অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে বৈঠকে বিশেষ দিকনির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে।
চূড়ান্ত অনুমোদনের পরবর্তী প্রক্রিয়া : সচিব কমিটির আজকের বৈঠকে যদি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশমালা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়, তবে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত অনুমোদনের পর চূড়ান্ত খসড়াটি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়ার পর অর্থ বিভাগ থেকে এই নবম পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তবে প্রয়োজন হলে আইন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশমালা ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।
পে স্কেলে যেভাবে দেওয়া ইনক্রিমেন্ট : নতুন বেতন স্কেলে নতুন নিয়মে ইনক্রিমেন্ট পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এক্ষেত্রে উচ্চ গ্রেডের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধা ভোগ করবেন নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। বাতিল হবে পুরোনো পদ্ধতির সব গ্রেডে একই হারে ইনক্রিমেন্ট। নবম পে-স্কেলের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্ভাব্য ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ। আর পঞ্চম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট ৪ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় গ্রেডে হচ্ছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং প্রথম গ্রেড নির্ধারিত থাকছে। বর্তমান স্কেলে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সব গ্রেডে গড়ে ৫ শতাংশ কার্যকর আছে। এছাড়া জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার টাকায় আনা হচ্ছে। আর সন্তানদের জন্য মাসিক শিক্ষা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশ ছিল ২ হাজার টাকা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



