ছবি: সংগৃহীত
অনেক আলোচনা-সমালোচনা শেষে অবশেষে ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে। ওইদিন সকাল ৯টায় জুলাই জাদুঘর প্রাঙ্গণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংস্কৃতিকর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। উদ্বোধন শেষে অতিথিরা জাদুঘর প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে জাদুঘরের পর্ষদ পুনর্গঠন হয়েছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট পর্ষদে সভাপতি হয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সদস্য সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন সদ্য নিযুক্ত জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত টিকিটের বিনিময়ে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করবেন। তবে এখনো জুলাই জাদুঘরের জনবল নিয়োগ হয়নি। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আপাতত প্রতিষ্ঠানটি চালানো হবে বলে জানা গেছে। সেইসঙ্গে জাতীয় জাদুঘরের কিছু জনবল সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা জাদুঘর উদ্বোধনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, জাদুঘরটি উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, এটি আশার কথা। তবে এত মানুষের রক্ত, এত মানুষের আবেগ যেখানে জড়িত সেই কাজে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা পরিষ্কার করার দরকার ছিল। উদ্বোধনের পরে হলেও এ বিতর্কের অবসান চান তারা।
বারবার তারিখ ঘোষণা করে উদ্বোধন না করা এবং এটি নির্মাণের অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করানো, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ উত্তোলন, গভীর রাতে নিয়োগ পরীক্ষাসহ অনেক অভিযোগ ওঠে নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব সমালোচনার মুখে পড়েন।
এ ব্যাপারে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীপন্থিদের বক্তব্য হলো-জনবল নিয়োগ দেওয়ার ৭ দিনের সময় বেঁধে দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। যে কারণে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে লিখিত পরীক্ষার বদলে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। কিন্তু পরে এটির সমালোচনার ভার নেয়নি মন্ত্রণালয়। বাতিল হয় নিয়োগ প্রক্রিয়া।
এছাড়াও কাজে যথাযথ সহায়তা না করা এবং নির্মাণসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় জাদুঘর উদ্বোধনের কাজ বিলম্ব হয়েছে। এজন্য একজন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা দায়ী। তবে কানিজ মওলা ভিত্তিহীন বলে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সদস্য বলেন, ‘জাদুঘর নির্মাণে দুর্নীতিসংক্রান্ত বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
জুলাই জাদুঘর নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ১৬ জুলাই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, ‘সরকারি অর্থ ব্যয়ে ক্রয়ের ক্ষেত্রে যেভাবে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা এড়িয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির যুক্তিতে কাজ দেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার বিষয় উঠে এসেছে, তবুও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। যদিও গত ১৪ জুলাই মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছিলেন, ‘সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে এবং তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দায়ীদের বিচার হওয়া দরকার : এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিতর্কের অবসান করেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরটি উদ্বোধন করা দরকার ছিল। কারণ এমন একটি মহৎ কাজে কোনো দুর্নীতি হোক, বিতর্ক থাকুক এমনটা প্রত্যাশিত নয়। তবে উদ্বোধন হয়ে গেলেই যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না বা স্বচ্ছতা প্রকাশ করা যাবে না-এমন তো নয়। তিনি দ্রুত জুলাই জাদুঘর নির্মাণে স্বচ্ছতা প্রকাশের দাবি জানান।
জুলাই শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা জাতিগতভাবে বিস্মৃতিপ্রবণ। সহজে অনেক কিছু ভুলে যাই। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরটির দরকার ছিল। অবশেষে জাদুঘরটি উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এটি অত্যন্ত ভালো খবর। তবে প্রতিটি ভালো কাজেই অনেক আলোচনা-সমালোচনা থাকে। আমি মনে করি জাদুঘর নির্মাণে যেসব প্রশ্ন উঠেছে তা উদ্বোধনের পরে তদন্ত করে সবার সামনে পরিষ্কার করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
উদ্বোধনীপর্বে আলোচনা ও সঙ্গীতায়োজন : শিল্পকলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, জাদুঘরের উদ্বোধনী আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমির সংগীত বিভাগের একটি দল দেশাত্মবোধক গান ও জুলাইয়ের গান গাইবেন। এছাড়াও সেখানে জুলাই আন্দোলন নিয়ে নির্মিত সিনেমা প্রদর্শন হবে। এর আগে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত অতিথিরা বক্তৃতা করবেন।
জাদুঘরে কী কী থাকছে : জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিবরণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও স্মারক, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবন থেকে উদ্ধার করা নথিপত্র, ঐতিহাসিক স্মারক ও শিল্পকর্ম যুক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনের আয়তন ১৭ দশমিক ৬৮ একর জায়গায় জাদুঘর প্রদর্শনের জন্য পাঁচটি নতুন পথ তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া তিন দিকে সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালনকক্ষ, টিকিট হাউজ, স্যুভেনির শপ, হেলিপ্যাডে জুলাই মঞ্চ এবং ২২টি সেল নিয়ে প্রতীকী আয়নাঘর বানানো হয়েছে।
শুধু জুলাই জাদুঘর নয়, জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহ ইত্যাদিসহ গুম-খুনের শিকার প্রায় চার হাজার মানুষের নাম ও স্মৃতি সংরক্ষণে মেমোরিয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।
করা হয়েছে আড়াই হাজারের বেশি ডামি কবর। ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন থিমে মোট ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র বানানো হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



