ছবি: সংগৃহীত
গত পাঁচ মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি চাল দিচ্ছিল সৌদি আরব। মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—যেকোনো মূল্যে একটি বিধ্বংসী আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলা। বিগত দিনে যখন একের পর এক ইরানি ড্রোন সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, তখনও রিয়াদ চরম সংযম দেখিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা বন্ধ হতে দেয়নি তারা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, কৌশলগতভাবে চারপাশ থেকে চরম অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই শীর্ষ পরাশক্তি।
বর্তমানে রিয়াদকে সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি ফ্রন্ট বা দিক থেকে শত্রুর মারাত্মক আক্রমণের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে তেহরানের প্রত্যক্ষ সামরিক হুমকি, অন্যদিকে ইরাক ও ইয়েমেনে সক্রিয় ইরানের শক্তিশালী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মুহুর্মুহু হামলা। তিন দিক থেকে অসম ও অতর্কিত যুদ্ধে পারদর্শী এই অপ্রত্যাশিত শত্রুদের একসঙ্গে সামলানো যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাকারীর জন্যই এক দুঃস্বপ্ন। ফলে বিগত এক দশক ধরে সৌদি আরবকে একটি আধুনিক, উন্মুক্ত ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরের যে দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা এখন অস্তিত্বের সংকটে।
লোহিত সাগরে হুথিদের থাবা: সৌদির রপ্তানি অর্থনীতিতে চরম আঘাত
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সপ্তাহান্তে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত দুটি প্রধান সৌদি তেল স্থাপনায় মিসাইল নিক্ষেপ করে। স্যাটেলাইট ইমেজ ও জিওলোকেটেড ভিডিওতে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে অবস্থিত জাজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে।
এখানেই শেষ নয়, হুথিরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেল ট্যাংকারের ওপর সফল হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের জন্য এই অবরোধ একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা। কারণ পারস্য উপসাগরের হরমোজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য থাকায়, সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে সুরক্ষিতভাবে পরিচালনা করছিল।
আগামী তিন বছরের মধ্যে এই লোহিত সাগর রুট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি সম্প্রসারণের একটি বিশাল পরিকল্পনা ছিল রিয়াদের। কিন্তু এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে হলে ইয়ানবু থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলোকে অবশ্যই বাব আল-মানদেব প্রণালি অতিক্রম করতে হবে। হুথিদের নতুন এই অবরোধের ফলে সৌদির মোট তেল রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখন সরাসরি হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই নতুন সহিংসতার নেপথ্যে রয়েছে পুরনো ক্ষোভ। ২০১৫ সালে হুথিদের ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়ে সৌদি আরব সাত বছর ধরে ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান চালায়, যা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও সেখানে কখনোই স্থায়ী শান্তি আসেনি। সম্প্রতি হুথিরা অভিযোগ করেছে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান থেকে ফেরা একটি উচ্চপর্যায়ের হুথি প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমানকে বাধা দিতে সৌদি আরব সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি বোমা হামলা চালিয়েছে। এর জের ধরেই লোহিত সাগরে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করেছে হুথিরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, রিয়াদ আপাতত আকাশপথেই এর জবাব দেবে। ইতোমধ্যে ট্যাংকারে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে হুথি নিয়ন্ত্রিত কৌশলগত হুদাইদাহ বন্দরে জোরালো বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমান বাহিনী।
ইরাক থেকে আসা নতুন বিপদ: রিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল
হুথিদের পাশাপাশি সৌদি আরবের জন্য দ্বিতীয় ফ্রন্টটি খুলে গেছে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে, অর্থাৎ ইরাক সীমান্ত থেকে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দক্ষিণ ইরাকের পাম গ্রোভস অঞ্চল থেকে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো এবং খোদ রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে একের পর এক আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিরাই মূলত প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে ইরাকের এই মিলিশিয়াদের দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় পারদর্শী করে তুলেছে।
পরপর ড্রোনের এই অনুপ্রবেশের পর অবশেষে রিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) স্থানীয় সময় ভোরে মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সৌদি আরবের ফাইটার জেটগুলোও সীমানা পেরিয়ে পূর্ব ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ঘাঁটিতে আকস্মিক ও অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট (সার্জিক্যাল স্ট্রাইক) হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সংঘাতের পরিধি বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই যৌথ অভিযানটি ছিল সৌদি আরবের ওপর চালানো ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার একটি কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া, যা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসির) প্রত্যক্ষ পরিচালনায় হয়েছিল। সৌদি কর্মকর্তারা ২০১৯ সালে তাদের আবকাইক শোধনাগারে হওয়া সেই বিধ্বংসী হামলার কথা এখনও ভোলেননি, যা সৌদির দৈনিক তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক স্তব্ধ করে দিয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, সেবারের হামলার উৎসও ছিল ইরাকের মাটি। ফলে এবার আর চুপ করে থাকা রিয়াদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ইরানের ছায়া ও ভঙ্গুর অর্থনীতি: কোন দিকে যাচ্ছে সৌদি আরব?
এই ত্রিমুখী সংকটের মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে ইরানের ছায়া স্পষ্ট। গত মার্চ ও এপ্রিলে যখন ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনগুলো সৌদির পূর্ব উপকূলের তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল, তখন থেকেই রিয়াদ আধুনিক অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এমনকি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রিয়াদ সফর করে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় একটি সমন্বিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা রাতারাতি স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুংকার দিয়ে দাবি করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ স্বাধীনভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলায় অংশ নিয়েছে। এর আগে সংঘাতের শুরুর দিকে সৌদি আরব ইরানের ওপর কিছু সতর্কতামূলক বিমান হামলা চালিয়েছিল, যা ছিল মূলত ওয়াশিংটন পাশে না থাকলেও নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতা প্রমাণের একটি স্পষ্ট বার্তা। বর্তমানে ইরান সরাসরি হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি ও স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে।
এই বহুমুখী সামরিক সংঘাতের কারণে সৌদি আরবকে ইতোমধ্যেই এক বিশাল অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হচ্ছে। যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভার এবং ধীরগতির বিশ্ব অর্থনীতির কারণে ২০১৮ সালের পর থেকে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক বাজেট ঘাটতি রেকর্ড করেছে তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি। যদিও বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ঘাটতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে, তবে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো যদি আবারও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে পুরো অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এমনকি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০ এর আওতাধীন অনেক মেগা-প্রজেক্টের (যেমন নিওম সিটি) পরিধি ও বাজেট ইতোমধ্যেই কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে রিয়াদ।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গাজা ও ইরান নীতির আকস্মিক পরিবর্তনে সৌদি কর্মকর্তারা রীতিমতো বিস্মিত ও হতাশ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা বর্তমানে নিবিড় থাকলেও, মার্কিন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আগ্রহ কমে গেলে একটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি রিয়াদকে একাই দাঁড়াতে হতে পারে—এই আশঙ্কা এখন সৌদি রাজপরিবারকে তাড়া করছে। একই সাথে প্রতিবেশী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথেও সম্পর্ক মেরামতের কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে, যা এখনও পুরোপুরি মজবুত নয়।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা। তিন দিক থেকে ঘিরে ধরা শত্রুর মোকাবিলায় সৌদি আরব স্পষ্টতই তার নীতি পরিবর্তন করেছে। রিয়াদ এখন আর নীরবে মার খাওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং সামরিক শক্তির প্রদর্শন ঘটিয়ে পাল্টা আঘাত হানার পথেই হাঁটা শুরু করেছে—যার পরিণতি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



