ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেটে ‘অলরাউন্ডার’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই যে নামটি সবার আগে মনে পড়ে, তিনি সাকিব আল হাসান। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে সাকিব শুধু একজন ক্রিকেটার নয়, হয়ে উঠেছেন একটি ‘ব্র্যান্ড’, একটি প্রতীক, একটি ইতিহাস। কখনো ব্যাট হাতে, কখনো বল হাতে—দল যখন দিশেহারা, তখন তিনি হয়ে উঠেছেন রক্ষাকবচ। তবে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও অন্যান্য কারণে জাতীয় দলের বাইরে আছেন এই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। আর এই সুযোগে আলোচনা শুরু হয়েছে—বাংলাদেশ কি কখনো আর সাকিবের মতো অলরাউন্ডার পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জাতীয় দলের সহকারী কোচ ও সাকিবের দীর্ঘদিনের মেন্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরিই বলে দিয়েছেন, “সাকিবের মতো অলরাউন্ডার আমরা আর কোনোদিন পাব না। এটা নিয়ে আশা করাটাই বাস্তবসম্মত নয়।”
সালাউদ্দিন বলেন, “আমাদের যারা বোলার আছে, তাদের মধ্যে যেন অন্তত ব্যাটিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, এটাই এখন লক্ষ্য। সাকিবের মতো অলরাউন্ডার তো পাব না, তবে ওদের ব্যাটিং যদি একটু ভালো হয়, সেটাই আমাদের জন্য অনেক কিছু। এখন যারা বোলিং করে তাদের যদি ব্যাট হাতেও ছোট ছোট অবদান থাকে, তাহলে দলের উপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “ফলাফলে হতাশা থাকতেই পারে। কিন্তু খেলোয়াড়দের ছোট ছোট উন্নতি অনুপ্রেরণা দেয়। যেমন তানজিম সাকিবের ব্যাটিংয়ে উন্নতি হচ্ছে, শেখ মেহেদী ভালো ব্যাট করছে, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ইতোমধ্যে পরিচিত একজন অলরাউন্ডার। তারা যত ভালো ব্যাট করবে, ততই উপরের ব্যাটারদের ওপর চাপ কমবে। এখন ৬ বা ৭ নম্বরে যারা ব্যাট করে তারা জানে—পেছনে আর কেউ নেই। তখন তারা বাড়তি চাপ অনুভব করে।”
সাকিব আল হাসানের মতো একজন খেলোয়াড় দলে থাকা মানেই ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগে একজন সম্পূর্ণ খেলোয়াড়ের অবদান। সালাউদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে আর তেমন কাউকে না-ও পায়, তবু এমন খেলোয়াড় গড়ে তোলার জন্য এখন থেকেই পরিকল্পিত কাজ করতে হবে।
“ওই সিগনালগুলো আমরা কোচেরা আগে থেকে বুঝি। কারো মধ্যে সম্ভাবনা থাকলে সেটিকে কীভাবে ঘষামাজা করে বের করে আনতে হয়, সেটাই হচ্ছে আমাদের কাজ,” বলেন সালাউদ্দিন।
“আমরা এখন চেষ্টা করছি—বোলারদের যেন ব্যাটিং টেকনিক আরও উন্নত হয়, যাতে ওরা দলের জন্য ব্যাট হাতেও অবদান রাখতে পারে। এজন্য বাড়তি ব্যাটিং প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে। যারা আগ্রহী, তাদের ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে কাজ করছি। এমনিতে বাংলাদেশের বোলারদের ব্যাটিং সচেতনতা আগে কম ছিল, এখন সেটা বাড়ছে,” তিনি বলেন।
সালাউদ্দিন আরও বলেন, “সাকিব নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়, হবেও। কিন্তু তার ক্রিকেট মস্তিষ্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, পরিস্থিতি বুঝে খেলা চালানো—এসবই তাকে বিশেষ করে তোলে। তিনি যখন মাঠে থাকেন, তখন বাকি দশজনের আত্মবিশ্বাস আলাদা থাকে। সে আত্মবিশ্বাস দলকে অনেক সময় ভরসা দিয়েছে।”
সাকিব একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি আইসিসি র্যাংকিংয়ে তিন ফরম্যাটেই (টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি) একাধিকবার শীর্ষ অলরাউন্ডারের স্থান দখল করেছেন। ২০১৯ বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ৬০৬ রান এবং বল হাতে ১১ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এমন পারফরম্যান্স এককভাবে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসেও বিরল।
বর্তমানে জাতীয় দলের বাইরে থাকা সাকিব ফের কবে ফিরবেন, তা অনিশ্চিত। তবে অনেকেই মনে করেন, তার অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা তরুণদের প্রস্তুত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যদি পরিকল্পিতভাবে সাকিবের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায়, তবে তার অভাব হয়তো কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব।
সালাউদ্দিন বলেন, “সাকিবের পথ ধরেই নতুনদের পথ তৈরি করতে হবে। সাকিব হয়তো চিরকাল খেলবেন না, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা যদি আমরা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তবে তা ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য দিকনির্দেশনার কাজ করবে।”
সাকিব আল হাসান একজন ব্যতিক্রমী ক্রিকেটার, একজন ‘জেনারেশন ডিফাইনিং’ তারকা। তার মতো অলরাউন্ডার আর কখনো বাংলাদেশে হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—নতুনদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া, তাদের ব্যাটিং-বোলিংয়ে ভারসাম্য তৈরি করা এবং দলকে একটি সুষম শক্তিতে পরিণত করা।
সাকিবের অভাব পূরণ না হোক, অন্তত তার অনুপ্রেরণায় তৈরি হোক এমন একদল ক্রিকেটার—যারা দেশের ক্রিকেটকে নিয়ে যেতে পারবে আরও এক ধাপ এগিয়ে। আর এ কাজেই ব্যাটিং শিখতে থাকা প্রতিটি বোলারের ব্যাটে যদি আরেকটু রান যোগ হয়, তবেই তৈরি হবে ভবিষ্যতের অলরাউন্ড ভিত্তি।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



