ছবি: সংগৃহীত
চীন ও মালয়েশিয়ায় ছয় দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান।
বৈঠকে অর্থনৈতিক করিডর, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ-মায়ানমার-চীন বাণিজ্য করিডর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় বেইজিং। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও চীন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ইস্যুটি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর কেমন হলো, কী পেল বাংলাদেশ? এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে রাজনীতিক ও কূটনীতিকরা প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন। এসব পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকর হবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সফলতার ওপর।
ঢাকা-বেইজিং ১৭টি ইস্যুতে সমঝোতা স্মারক সই করার মাধ্যমে বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরো বিস্তৃত করে সম্পর্কের নতুন যুগে প্রবেশ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে।
উভয় দেশ বেশ কিছু সহযোগিতার কথা বলেছে। প্রস্তাবে রয়েছে—মায়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণ এবং কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন মাত্রা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা তৈরি। আবার বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট ৯.২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীনের ১১টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও শীর্ষ কর্মকর্তারা এই প্রস্তাব দেন। এদিকে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চতুর্মুখী পারস্পরিক ‘ব্যালান্স’ কূটনীতিতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশ্লেষকরা।
চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ কী পেল বলা মুশকিল। কেবল তো এমওইউ সই হয়েছে। অনেকগুলো এমওইউ সই হয়েছে। বাংলাদেশ-মায়ানমার-চীনের ইকোনমিক করিডর নিয়ে শি চিনপিং আলোচনা করেছেন। এমওইউ সই করা আর ইমপ্লিমেন্টেশনের মধ্যে কিন্তু বড় গ্যাপ আছে। চীনের দিক থেকে তারা প্রস্তুত সাহায্য করা ও সাপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কতখানি প্রস্তুত—সেটি আমাদের দেখতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কারণ এখানে বেশ কিছু বিষয় আছে, যা ইঙ্গিত করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। যেমন—টু প্লাস টু অ্যাগ্রিমেন্ট যেটা করেছে, ফরেন পলিসি এবং সিকিউরিটি—সেটাও বলে দিয়েছে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক রাখবে। আবার তাইওয়ানের ব্যাপারেও বাংলাদেশ আর চীন অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশ চীনা পলিসিতে অনড় থাকবে। এ বিষয়গুলো এখন আমেরিকা কিভাবে দেখবে, সেটা দেখার বিষয়। তবে এমনিতে যথেষ্ট প্রোডাক্টিভ যে এমওইউগুলো সই করা হয়েছে সেগুলো এখন যদি ইমপ্লিমেন্টেশনে যাওয়াটা ত্বরান্বিত করতে পারেন।’
চীন ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা শীতল হচ্ছে এমন ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ভারত অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতখানি যুক্তরাষ্ট্র আর চীন। এদিকে ভারতের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার বিষয়ে। ট্রাম্পের কারণে সেটা কতখানি রক্ষিত হবে, সেটা দেখা দরকার। তবে কোনো সন্দেহ নেই, তাদের মধ্যেও আমরা যখন কথা বলছি ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য কিন্তু চীন। আমরা অলরেডি জেনেছি, ডোনাল্ড ট্রাম্প দিল্লি সফর করবেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে ভারতকে যেভাবে ভেবেছিল আমেরিকার সঙ্গেই সারাক্ষণ থাকবে সেটা হচ্ছে না। এই জায়গায় বাংলাদেশ আর ভারত ইস্যু চীনের কাছে অতখানি বড় নয়, যতখানি বড় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শি চিনপিং যখন আলোচনায় নিয়ে এলেন বাংলাদেশ, মিয়ানমার আর চীনের ইকোনমিক করিডর, সেটা স্বাভাবিকভাবে আমরা সবাই জানি যে ওটা রোহিঙ্গা বিষয়ে সমাধান না করে সম্ভব নয়। যেহেতু এই ইকোনমিক করিডর মূল আরাকানের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, সে জায়গায় দেখা দরকার যে কিভাবে এই ইকোনমিক করিডর হবে, যেটা রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের ওপর নির্ভর করবে। আমাদের এখন দেখা দরকার, ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে রোহিঙ্গাবিষয়ক সমস্যার সমাধান হচ্ছে কি না।’
এদিকে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে গত শুক্রবার এক প্রশ্নে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত চীন। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো বিষয়ে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চাই আমরা।’
তিনি বলেন, ‘জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চীন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, এটা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হয়। এরপর প্রথম বিদেশ সফরে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী। পরের দিন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। মালয়েশিয়া হয়ে চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরকে ‘ইতিবাচক’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটার বড় অংশ চীন থেকে আসে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত সহযোগিতাও রয়েছে। কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার যাত্রায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার কাঠামোগত প্রক্রিয়া তৈরির উপায় অনুসন্ধানের কথা বলেছে ঢাকা-বেইজিং। ‘টু প্লাস টু’ নামে পরিচিতি এই কাঠামোগত প্রক্রিয়া এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে তৈরি করেছে চীন। আর একই ধরনের প্রক্রিয়ার কথা বলেছে তুরস্ক ও বাংলাদেশ।
চীনের করিডরের প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘অবশ্যই আমরা চাই ব্যাবসার প্রসার হোক, বাণিজ্যের প্রসার হোক। তাহলে বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হবে। নতুন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, ট্রেড ভলিউম বাড়বে। সুতরাং আমরা এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।’
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বাংলাদেশের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে চীন পাশে থাকবে। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রেসিডেন্ট শি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় চীন ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ হয়ে থাকবে।”
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘ এ সফর মূলত বাংলাদেশের উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা দূর করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মালেশিয়ানরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন। এই সফরের মধ্যে থেকে সেই লক্ষ্য অর্জন করার বিষয় আছে।’
সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন ও প্রয়োজন ভিন্ন। তাই দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
গত বৃহস্পতিবার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর লি ছিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বেইজিং সফরের শেষ দিনে স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ১১টায় গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ মিনিটের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এর পরপরই দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘এ সফরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। বহুমাত্রিক সহযোগিতার একটি সমঝোতা হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় পার্টনারের সঙ্গে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা ডিপ্লোমেটিক রিলেশনশিপ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মধ্যে দিয়ে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে চীন সম্ভবত একটা ভূমিকা রাখতে চলেছে।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



