ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর নিখোঁজ থাকা তৃতীয় মার্কিন সেনাসদস্যও মারা গেছেন বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। এ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, নিহত বলে ধারণা করা ওই সেনাসদস্য হলেন নিউইয়র্কের ২৮ বছর বয়সী সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল এস র্যাম্পারস্যাড। জর্দানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মার্কিন সেনাবাহিনী এর আগে একই হামলায় নিহত আরো দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছিল। তারা হলেন হাওয়াইয়ের ইওয়া বিচ এলাকার ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ক্যারলটনের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে সহায়তা করার জন্য ওই সেনাদের জর্দানে মোতায়েন করা হয়েছিল। মার্কিন সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের সরাসরি হামলায় এই প্রথম মার্কিন সেনারা নিহত হলেন।
জর্দানের ঘাঁটিতে হামলার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রথমে জানিয়েছিল, দুই সেনা নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। এর পরদিন মার্কিন সেনারা কিছু অজ্ঞাত মরদেহের অংশ উদ্ধার করেন।
সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছিল। পরে পেন্টাগন জানায়, নিখোঁজ ওই সেনাসদস্যই সম্ভবত সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল র্যাম্পারস্যাড। বর্তমানে সরকারি নথিতে তার অবস্থা ‘দায়িত্বকালীন অবস্থায় নিখোঁজ’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ‘মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে’ বলেও জানানো হয়েছে। র্যাম্পারস্যাড জার্মানির আনসবাখে অবস্থানরত দশম আর্মি এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডের সদস্য ছিলেন।
নিহত আরেক সেনা ইসাবেলা গনজালেসও একই ইউনিটে কর্মরত ছিলেন।
এদিকে ইরাকে নিহত আরেক মার্কিন সেনার পরিচয়ও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার ৩০ বছর বয়সী সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টন। সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রবিবার ইরাকের ইরবিল বিমানঘাঁটিতে একটি ইরানি ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় তিনি নিহত হন। সুইন্টন প্রায় এক দশক ধরে মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগভিত্তিক ৫৫তম এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি রেজিমেন্টের ১০৮তম এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডে কর্মরত ছিলেন।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তার মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। সুইন্টনকে মরণোত্তর ব্রোঞ্জ স্টার, পার্পল হার্ট এবং কমব্যাট অ্যাকশন ব্যাজ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাকে পদোন্নতি দিয়ে স্টাফ সার্জেন্ট করা হবে। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন। তার মা জানিয়েছেন, সুইন্টনের একটি ছেলের বয়স ছয় বছর এবং একটি মেয়ের বয়স চার বছর। সুইন্টনের স্ত্রী মিয়া গনজালেস-সুইন্টন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, এই শোক তিনি কখনো কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এখন তার জীবন ভেঙে পড়েছে। সুইন্টনের মা ক্রিস্টেল সুইন্টন বলেন, তার ছেলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা করতেন। তিনি বলেন, যেসব মানুষের জীবনে সুইন্টন প্রভাব ফেলেছেন, তাদের স্মৃতির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন। তার হাসি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে। আর্মি এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডের কমান্ডিং জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জন এল ডবার বলেন, সার্জেন্ট সুইন্টন ছিলেন একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নিজের দায়িত্ব ও সহকর্মীদের নিয়ে সুইন্টনের গর্ব ছিল। তিনি সাহস, সম্মান এবং নিঃস্বার্থভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে, যেখানে মার্কিন সেনারাও মোতায়েন রয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, দুই পক্ষের হামলায় এমন অনেক বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলো কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করেন। এই সংঘাতে জাহাজের শ্রমিক, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিক এবং ইসরায়েল ও লেবাননের অনেক মানুষও নিহত হয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নতুন এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ইরান এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতেই এই যুদ্ধ প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার জন্য ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। কারণ নির্বাচনি প্রচারে তিনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। র্যাম্পারস্যাডকে মৃত বলে ধারণা করা এবং ইরাকে নিহত সুইন্টনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



