ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অনলাইন আয়কর রিটার্ন (ই-রিটার্ন) দাখিলের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। বুধবার (২২ জুলাই) থেকে এ সেবা চালু হওয়ার পাশাপাশি দেশের অধিকাংশ স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করবর্ষে করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নিট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত বা প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।
এনবিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করসেবা আরও সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসেবে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন সেবা চালু করা হয়েছে। করদাতাদের ঘরে বসেই রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহের সুযোগ দিতে এই ব্যবস্থা আরও উন্নত করা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর প্রতি বছরই ই-রিটার্ন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা অনলাইনে সফলভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। এই সংখ্যা দেশের কর ব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করছে এনবিআর।
এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনভিত্তিক কর ব্যবস্থার কারণে করদাতাদের কর অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকাংশে কমে এসেছে। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি কর প্রশাসনের কার্যক্রমও আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাই সহজ হওয়ায় কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এবার বিশেষ আদেশ জারি করে অধিকাংশ স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ যেসব করদাতা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তাদের এখন থেকে ই-রিটার্নের মাধ্যমেই রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
তবে কয়েকটি শ্রেণির করদাতাকে এ বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা, প্রয়োজনীয় সনদপত্র সাপেক্ষে শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক, মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক চাইলে আগের মতো কাগজে (পেপার) আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
এ ছাড়া প্রযুক্তিগত বা নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোনো করদাতা যদি ই-রিটার্ন সিস্টেমে প্রবেশ করতে না পারেন বা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল সম্ভব না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত কর কমিশনার বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এনবিআর জানিয়েছে, করদাতাদের জন্য কর পরিশোধ ব্যবস্থাও এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হয়েছে। এনবিআরের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই আয়কর পরিশোধ করা যাবে। ফলে ব্যাংক বা কর অফিসে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না।
রিটার্ন দাখিলের পর করদাতারা তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (Acknowledgement Receipt) সংগ্রহ করতে পারবেন। পাশাপাশি আয়কর সনদও তাৎক্ষণিকভাবে ডাউনলোড করা যাবে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ব্যাংক ঋণ, ভিসা আবেদন কিংবা অন্যান্য আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজে আয়কর সনদের প্রয়োজন হয়। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সনদ পাওয়ার সুবিধা করদাতাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি তৈরি করবে বলে মনে করছে এনবিআর।
করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে নতুন করবর্ষে একটি বিশেষ কর প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষ থেকে যেসব ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা জুলাই, আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন, তারা নিট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পাবেন। তবে এই প্রণোদনার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ কোনো করদাতার ৫ শতাংশ কর রেয়াতের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেও তিনি সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকাই সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসের পর রিটার্ন দাখিল করলে এই প্রণোদনা আর পাওয়া যাবে না।
এনবিআর আরও জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে পরবর্তীতে অতিরিক্ত করের দায়ও সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের পর আয়কর রিটার্ন জমা দিলে আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। তাই করদাতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন দাখিলের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ই-রিটার্ন দাখিলে কোনো ধরনের সমস্যা বা জটিলতা দেখা দিলে করদাতারা সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অফিস চলাকালে এনবিআরের কল সেন্টার (০৯৬৪৩৭১৭১৭১)-এ যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে পারবেন। পাশাপাশি এনবিআরের অন্যান্য ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এনবিআরের মতে, ডিজিটাল কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে করদাতাদের সেবা আরও আধুনিক, সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রেও ই-রিটার্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এজন্য সব যোগ্য করদাতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে নতুন করবর্ষের সুবিধাগুলো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



