ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে আবারও হামলা শুরু করার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পরই এ হামলা শুরু হলো। এই ক্রমবর্ধমান আক্রমণ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানায়, তারা ‘ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালাচ্ছে এবং এটি ‘ইরানের অযৌক্তিক ও অব্যাহত আগ্রাসনের জবাব’ হিসেবে করা হচ্ছে।
এর একদিন আগে, হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন সেনা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। ট্রাম্প ওই ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেন। তিনি ইরানকে যুদ্ধের অবসানে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বানও জানান।
বুধবার (১০ জুন) যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে গুলি চালিয়েছে, যা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ লঙ্ঘন করে ইরানি তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল।
পরে ট্রাম্পের মন্তব্য যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘাতের অবসানে একটি চুক্তি হতে পারে।
টানা কয়েক সপ্তাহের ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও ইরান দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। দেশটি মনে করছে, হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়ার সক্ষমতা তাদের জন্য একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির হাতিয়ার। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি চায়, তবে তাকে শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকতে হবে।
বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেন, ইরান কখনোই হুমকি ও চাপের মুখে আলোচনা করেনি এবং করবে না। ইরান চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে না।
এর মধ্যেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কিছু লক্ষ্য অনুসরণ করছেন, যা আপসের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। তার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরান সরকারের পতন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ বিলোপ এবং লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করা। সোমবার ইরান ও ইসরাইল পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা দিয়েছে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড বুধবার ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারের ওপরে লেনদেন হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্প বুধবার বলেন, গত মাস থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি ‘গোপন অভিযান’ চালাচ্ছে, যার মাধ্যমে ইরানের বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ পার করা হচ্ছে। তার দাবি, ইরানের রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়ার ফলে রাতের আঁধারে জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবারের আগের হামলাগুলোতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং নজরদারি রাডার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইরান দাবি করেছে, মার্কিন হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক শহরের দুটি পানির রিজার্ভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে হাজারো মানুষের পানি সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
পরে তেহরান কুয়েত, বাহরাইন এবং জর্ডানে হামলার দাবি করে। জর্ডান জানায়, তারা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, যেগুলো মার্কিন সামরিক বিমান মোতায়েন থাকা একটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে ইরান দাবি করেছে। বাহরাইন ও কুয়েতও জানায়, তারা নিজেদের দিকে আসা হামলা প্রতিহত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন হামলাকে ইরানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই টেলিভিশনে দেয়া মন্তব্যে বলেন, নতুন হামলার পর ইরান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে সমঝোতার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শের পর কাতারের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার তেহরানে পৌঁছেছে বলে এ সফর সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা জানান। আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন) হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হেলিকপ্টারটির সঙ্গে একটি ইরানি ড্রোনের সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে সংঘর্ষটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন ট্রাম্প দ্রুত কোনো সাফল্য অর্জন করতে চান বলে মনে হচ্ছে। তবে তিনি এমন কিছু দাবি করছেন, যা ইরানের জন্য মেনে নেয়া কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিক। ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে, যদিও এই ইউরেনিয়াম ‘অস্ত্র-মানের পর্যায়ে’ পৌঁছাতে খুব অল্প প্রযুক্তিগত ধাপ দূরে রয়েছে।
ইরান ইউরেনিয়াম ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করেছে। পাশাপাশি চূড়ান্ত চুক্তির আগেই জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করারও দাবি জানিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই মতপার্থক্য কীভাবে দূর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে খুব বেশি সময় নিচ্ছে’ এবং এখন তাদের ‘এর মূল্য দিতে হবে!!!’
সূত্র: এনডিটিভি
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



