ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ঢালিউডে মুক্তি পেয়েছে মোট ২২টি সিনেমা। এর মধ্যে দুই ঈদেই মুক্তি পেয়েছে ১২টি সিনেমা, আর বাকি পাঁচ মাসে মাত্র ১০টি। সংখ্যার হিসেবে বছরজুড়ে ২০২৪ সালের মতোই একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং দর্শক আগ্রহের দিক থেকে এই সময়টা ঢাকাই সিনেমার জন্য কতটা আশাব্যঞ্জক ছিল, সেটি এখনই বলা কঠিন। তবে চলতি সময়ের সিনেমাগুলোর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে একটা মোটামুটি চিত্র দাঁড়িয়ে যায়, যা ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও দেয়।
এ সময়ের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা আলোচনায় এসেছে, আর ব্যবসায়িকভাবে সাফল্যের মুখ দেখেছে মাত্র কয়েকটি। বাকিগুলো প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে কিংবা সীমিত প্রদর্শনীতেই থেমে গেছে। নিচে মাসভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যাক, কী ঘটেছে এই ছয় মাসের ঢাকাই সিনেমা জগতে।
জানুয়ারি: প্রত্যাশার সূচনাই হতাশাজনক
বছরের শুরুটা হয়েছিল বেশ কিছু নতুন সিনেমা দিয়ে। ৫ জানুয়ারি মুক্তি পায় শিশির সরদার ও এলিনা শাম্মি অভিনীত ‘মধ্যবিত্ত’। এটি পরিচালনা করেছেন তানভীর হাসান। যদিও প্রেক্ষাগৃহে এর প্রভাব ছিল একেবারেই নগণ্য। প্রথম সপ্তাহেই সিনেমাটি দর্শকের মনোযোগ পেতে ব্যর্থ হয়।
পরের সপ্তাহে অনন্য মামুন পরিচালিত ‘মেকাপ’ ও আব্দুল হান্নানের পরিচালনায় ‘কিশোর গ্যাং’ মুক্তি পায়। এই দুটি ছবিও একই রকমভাবে বাণিজ্যিক ব্যর্থতার খাতায় নাম লেখায়। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমাটি ছিল ব্যতিক্রম। নভেরা রহমান অভিনীত সিনেমাটি প্রশংসিত হয়েছে অভিনয় ও নির্মাণ গুণে, যদিও বক্স অফিসে এটি তেমন কোনো ঝড় তুলতে পারেনি।
ফেব্রুয়ারি: ভালোবাসার মাসেও ভালোবাসা পেল না সিনেমা
ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় চারটি সিনেমা। নাসির উদ্দিন খান অভিনীত ‘বলি’ কিছুটা আলোচনায় এলেও দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারেনি। এ সিনেমাটি অবশ্য আন্তর্জাতিক কিছু উৎসবে অংশগ্রহণ করায় মিডিয়ায় কিছুটা সাড়া ফেলে। একই সময়ে মুক্তি পায় সাইমন সাদিকের ‘দায়মুক্তি’। দর্শক প্রতিক্রিয়া হতাশাজনক ছিল।
ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে রাফিয়াথ রশীদ মিথিলা ও এফ এস নাঈম অভিনীত ‘জলে জ্বলে তারা’ মুক্তি পেলেও, এর ব্যবসায়িক পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। অন্যদিকে রাজ রিপা ও কায়েস আরজু অভিনীত ‘ময়না’ পুরোপুরি দর্শক বিমুখ হয়ে পড়ে।
মার্চ: ঈদের সিনেমা এনে দিল সামান্য স্বস্তি
বছরের তৃতীয় মাসে সবচেয়ে বেশি সিনেমা মুক্তি পায়—মোট ছয়টি। এর মধ্যে শাকিব খান ও ইধিকা পাল অভিনীত ‘বরবাদ’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। প্রযোজকদের দাবিতে, এটি ১৫ কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত হয়ে ৫০ দিনে ৭৫ কোটি টাকার মতো ব্যবসা করেছে। যদিও এ তথ্য নিশ্চিতভাবে যাচাই করা যায়নি, তবে প্রেক্ষাগৃহগুলোর ভিড় এই দাবিকে আংশিকভাবে সমর্থন করেছে।
আফরান নিশো ও তমা মির্জা অভিনীত ‘দাগি’ সিনেমাটিও প্রশংসা পেয়েছে। শিহাব শাহীনের পরিচালনায় এই জুটি দর্শকের মনোযোগ কেড়েছে, এবং সিনেমাটি প্রায় ১০ কোটি টাকার গ্রস সেল করেছে বলে দাবি প্রযোজকদের।
এ মাসে মুক্তি পাওয়া সিয়াম আহমেদ, শবনম বুবলী ও দীঘি অভিনীত ‘জংলি’ প্রায় ৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। এদিকে মোশাররফ করিমের ‘চক্কর ৩০২’ ছিল ঈদের আরেকটি আলোচিত সিনেমা। তবে ‘জ্বীন-৩’ (সজল-ফারিয়া) ও ‘অন্তরাত্মা’ (শাকিব খান) দুটি সিনেমাই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় এবং ব্যবসায়িকভাবে ফ্লপ হয়।
এপ্রিল: শূন্যতার মাস
চতুর্থ মাসে কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি, যা এই সময়ের জন্য চিন্তার বিষয়। এমনকি ঈদের পরেও কোনো সিনেমা মুক্তির সাহস দেখায়নি কেউ। এর মধ্যে দিয়ে ইন্ডাস্ট্রির অচলাবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাব কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মে: বড় তারকার সিনেমাও হতাশ করল
মে মাসে মুক্তি পায় দুটি সিনেমা। এর মধ্যে একটি ছিল জয়া আহসান অভিনীত ‘জয়া আর শারমিন’। করোনাকালীন বাস্তবতাকে ঘিরে নির্মিত এ সিনেমাটি উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করলেও, শেষমেশ হলে দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়।
অন্যদিকে ‘আন্তুঃনগর’ সিনেমাটি প্রচারণাহীনভাবে মুক্তি পায় এবং দর্শকের কোনো আগ্রহ না থাকায় কয়েক দিনেই প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এটি ছিল প্রায় নিঃশব্দে মুক্তি পাওয়া একটি ব্যর্থ প্রয়াস।
জুন: কোরবানির ঈদে জমজমাট কিছু, আবার কেউ কেউ মুখ থুবড়ে
জুন মাসে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। এগুলোর মধ্যে শাকিব খান ও সাবিলা নূর অভিনীত ‘তাণ্ডব’ শুরুতেই আলোচনায় উঠে আসে। যদিও সমালোচনার মুখেও পড়ে সিনেমাটি। জয়া আহসানের উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে কিছু আগ্রহ জাগালেও, সিনেমাটি পুরোপুরি সাফল্য পায়নি।
এই মাসের সবচেয়ে সফল সিনেমা ছিল ‘উৎসব’। এতে অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী, সুনেরাহ ও সাদিয়া আয়মান। মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে এটি এখনো পর্যন্ত সর্বাধিক হাউজফুল শো পেয়েছে। বক্স অফিসে গ্রস সেল এবং দর্শক আগ্রহ—দুই ক্ষেত্রেই ‘তাণ্ডব’কে পেছনে ফেলেছে।
তাসনিয়া ফারিণ ও শরিফুল রাজ অভিনীত ‘ইনসাফ’ সিনেমাটি মুক্তির শুরুতে বেশ আলোচিত হলেও ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারেনি। শো সংখ্যা কমে যাওয়ায় এটি খুব দ্রুতই প্রেক্ষাগৃহে প্রভাব হারায়।
আরও মুক্তি পেয়েছে আজমেরী হক বাঁধন অভিনীত ‘এশা মার্ডার: কর্মফল’। মুক্তির পর প্রচারণা কম থাকায় আলোচনার বাইরে ছিল। তবে দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রচার বাড়ায় দর্শক কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছে, তবুও বাণিজ্যিকভাবে এটি সফল নয়।
আরেফিন শুভ ও মন্দিরা চক্রবর্তী অভিনীত ‘নীলচক্র’ এবং আদর আজাদ ও পূজা চেরীর ‘টগর’—এই দুটি সিনেমাও প্রেক্ষাগৃহে টিকতে পারেনি।
সিনেমার সংখ্যা বাড়লেও, সাফল্যের হার কম
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ঢালিউডে মুক্তিপ্রাপ্ত ২২টি সিনেমার মধ্যে আলোচনায় এসেছে মাত্র ৭-৮টি, আর সত্যিকারের বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে ৩-৪টি মাত্র। এর মধ্যে ‘বরবাদ’, ‘উৎসব’, ‘দাগি’ ও আংশিকভাবে ‘জংলি’ কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার অনেকটাই অধরাই থেকে গেছে।
বছরের বাকি ছয় মাসে যদি শক্তিশালী স্ক্রিপ্ট, তারকাবহুল কাস্ট, পরিকল্পিত প্রচারণা ও মাল্টিপ্লেক্সের সমন্বিত প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সিনেমা মুক্তি পায়, তবে হয়তো বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যায় যেমন ভারসাম্য থাকবে, তেমনি দর্শক ফিরিয়ে আনার স্বপ্নও কিছুটা বাস্তবায়িত হতে পারে। নইলে ২০২৫ সালও ঢাকাই সিনেমার জন্য একটি মাঝারি মানের বছর হিসেবেই থেকে যাবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



