ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী মহলের সমালোচনার মুখে থাকা ন্যূনতম কর সংক্রান্ত বিধান থেকে সরে আসছে সরকার। আগামী বাজেটে এ বিধান বাতিল করে উৎসে কাটা করকে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর (Advance Tax) হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলে বা করযোগ্য আয় না থাকলে উৎসে কাটা অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় কিংবা ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে দেশের করব্যবস্থায় এটি একটি বড় নীতিগত সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও তারল্য সংকট কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি কমানো, কর নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে যৌক্তিক করা এবং আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে আরও কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ে উৎসে যে কর কেটে রাখা হয়, তার একটি অংশ ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লাভ না থাকলেও কিংবা ব্যবসায় লোকসান হলেও সেই অর্থ আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ কারণে কার্যত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কর দিতে বাধ্য হতে হয়, যা করনীতির মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এ ব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। তাদের অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ বা চলতি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকটে ভোগেন। অথচ উৎসে কাটা কর ফেরত না পাওয়ায় সেই অর্থ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকে। এতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হয় এবং বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়।
নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় উৎসে কাটা অর্থকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ বছরের শেষে আয়কর হিসাব চূড়ান্ত করার সময় সেই অর্থ সমন্বয় করা যাবে। যদি প্রতিষ্ঠানের করযোগ্য আয় না থাকে বা প্রদেয় করের পরিমাণ উৎসে কাটা অর্থের চেয়ে কম হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে করদাতাদের আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ছোট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বছরে ১ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করল এবং বন্দরে উৎসে কর হিসেবে ৫ লাখ টাকা কেটে নেওয়া হলো। কিন্তু বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে থাকায় তার কোনো করযোগ্য আয় রইল না। বিদ্যমান আইনে সেই ৫ লাখ টাকা কার্যত ন্যূনতম কর হিসেবে থেকে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটি তা ফেরত পায় না। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ওই অর্থ অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের পর অতিরিক্ত অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, এটি নিঃসন্দেহে ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে রিফান্ডের অর্থ দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। যদি দীর্ঘসূত্রতা বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, রিফান্ড ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও সময়সীমাভিত্তিক করা প্রয়োজন, যাতে করদাতারা অযথা হয়রানির শিকার না হন।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যূনতম করের বর্তমান বিধান অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায় না। একটি প্রতিষ্ঠান লাভ করলে কর দেবে—এটাই করনীতির স্বাভাবিক নীতি। কিন্তু লোকসান বা করযোগ্য আয় না থাকা সত্ত্বেও কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকেও বাধ্যতামূলকভাবে কর আদায়ের ব্যবস্থা করব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা হলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমবে, নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে করব্যবস্থার প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
শুধু ন্যূনতম কর বিধান বাতিলই নয়, আসন্ন বাজেটে ব্যবসাবান্ধব আরও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে উৎসে কর না কাটার কারণে করমুক্ত খরচ বাতিলের বিধান প্রত্যাহারের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যয়কে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা সম্ভব হবে এবং করযোগ্য আয় হিসাবেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ ছাড়া অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কর অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় ও ঝুঁকিভিত্তিক করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় মানবিক হস্তক্ষেপ কমে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ কর প্রশাসনকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও করদাতাবান্ধব করে তুলবে।
তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ন্যূনতম কর বিধান বাতিলের ফলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ, এতদিন যে অর্থ ন্যূনতম কর হিসেবে সরকারের কাছে থেকে যেত, নতুন ব্যবস্থায় তার একটি অংশ ফেরত দিতে হতে পারে। তবে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের করব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, বিনিয়োগবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



