ছবি: সংগৃহীত
সরকার গঠনের পর যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত হবে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এতে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। সরকার গঠনের পর মিত্রদের সঙ্গে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম বড় পরিসরের রাজনৈতিক বৈঠক, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
রোববার সন্ধ্যায় বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়েই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ককে আরও সুসংহত করা, শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা। আন্দোলনের সময় যেসব দল বিএনপির সঙ্গে একযোগে সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময়ের এটিই প্রথম উদ্যোগ।
সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চান। সে কারণেই যুগপৎ আন্দোলনের সব শরিক দল ও জোটের প্রতিনিধিদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শুধু বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাই নন, নির্বাচনের আগে যারা নিজেদের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, তাদেরও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সরকার গঠনের পর সেটিকে নতুন বাস্তবতায় কীভাবে ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে শরিকদের মতামত, প্রত্যাশা ও পরামর্শ শুনে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণেরও সুযোগ তৈরি হবে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বৈঠকে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ বা শুভেচ্ছা বিনিময়ই হবে না; বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের অগ্রাধিকার, গণতান্ত্রিক সংস্কার, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিভিন্ন শরিক দলের পক্ষ থেকে আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরা হতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপি ও শরিকদের একাধিক সূত্রের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসন বণ্টন নিয়ে অনেক শরিক দলের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তার সবকিছু বাস্তবায়িত হয়নি বলে অনেক নেতা মনে করেন। ফলে আজকের বৈঠকে সেই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময়ের জোটগত সমঝোতা এবং সরকার গঠনের পর বাস্তব রাজনীতির মধ্যে কিছু পার্থক্য তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই বাস্তবতায় শরিক দলগুলোর অবস্থান, তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, গত পাঁচ মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি কার্যক্রমে বিএনপির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই ‘একলা চলো’ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা বা সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তাই আজকের বৈঠকের মাধ্যমে সরকার ও বিএনপির প্রকৃত রাজনৈতিক মনোভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করবেন তারা।
তাদের মতে, এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—সরকার ভবিষ্যতেও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কি না, নাকি সম্পর্ক কেবল আন্দোলনের সময় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। শরিকদের ভাষ্য, এ প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে বিএনপির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সরকার ও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং শরিকদের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করবেন। তার ভাষায়, সরকার শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে যাচ্ছে, সেটি জানা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বৈঠকে কথা বলার সুযোগ পেলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করবেন। তার মতে, সরকার রাজনৈতিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। সে বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শও তুলে ধরবেন।
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, বৈঠকে ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি জাতীয় সরকার গঠনের প্রশ্নেও তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে চান।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।
তিনি জানান, যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি। সে কারণে দলটিকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
জানা গেছে, বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছে যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন জোট ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতারা। এর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
এ ছাড়া ১২ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও আমন্ত্রণ পেয়েছে।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম), জাগপা, ডেমোক্রেটিক লীগ, বাংলাদেশ মাইনোরেটি জনতা পার্টি, ইসলামিক পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি এবং এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টির প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেবেন।
এ ছাড়া গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সাম্যবাদী দল (এমএল), সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসডিপি) এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) আমন্ত্রিত রয়েছে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, সমাজতান্ত্রিক পার্টি ও জাতীয় গণফ্রন্টের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ এবং ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে সরকারের এই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। বিশেষ করে সরকার ও শরিকদের পারস্পরিক আস্থা, সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এই বৈঠকে যে আলোচনা হবে, তা আগামী দিনের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া বিভিন্ন অসন্তোষ নিরসন, জোটগত সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমন্বিত অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



