ছবি: সংগৃহীত
দুপুরে মেয়ে স্কুল থেকে ফিরবে। গরম ভাত নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা আমিনা ইসলাম মিলি; কিন্তু সেদিন আর ফেরেনি তাঁর ১২ বছরের মেয়ে নুসরাত।
কিছুক্ষণ পর খবর আসে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
উদ্বিগ্ন মা প্রথমে ছুটে যান স্কুলে, তারপর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আহতদের তালিকায় মেয়ের নাম পেলেও প্রথম দেখায় তাকে চিনতেই পারেননি তিনি। আগুনে ঝলসে যাওয়া মুখ, ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই হাত আর পুড়ে যাওয়া চুল—এ যেন তাঁর সেই চেনা নুসরাত নয়।
এক বছর পরও সেই বিভীষিকা কাটেনি। নুসরাতের মা আমিনা ইসলাম মিলি বলেন, নুসরাত এখন নিজের হাতে খেতে পারে না। অন্যের সাহায্যে খেতে হয়। গ্রাফটিং করা হাতে সারাক্ষণ ব্যথা আর চুলকানি।
আগে নিজের হাতে পুঁতির ব্রেসলেট বানাত। এখন নিজের হাতের দিকেই তাকাতে চায় না সে।
তিনি জানান, মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এড়াতে নুসরাত স্কুলে কালো গ্লাভস পরে যায়। রোদ কিংবা ঠাণ্ডা দুই আবহাওয়ায়ই পোড়া চামড়ায় সমস্যা হয়। তাই নিয়মিত স্কুলে যাওয়াও সম্ভব হয় না।
শুধু নুসরাত নয়, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া অন্তত ৩০ জন শিশু ও শিক্ষক এখনো আগুনের দগদগে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। কারো মুখ বিকৃত হয়ে গেছে, কারো হাত আর আগের মতো কাজ করে না। কেউ ব্যথায় রাতভর ঘুমাতে পারে না, কেউ আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ভয় পায়। আহতদের অভিভাবক, চিকিৎসক এবং স্কুলের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে মোট ৬৩ জন জীবিত আছে। এর মধ্যে ৩৭ জন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এবং অন্য ২৬ জন দেশের অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
এ দুর্ঘটনায় মোট ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে ২০ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৫ জন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন, ইউনাইটেড হাসপাতালে একজন এবং লুবানা জেনারেল হাসপাতালে একজন মারা যায়।
বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ৫৭ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। অন্য রোগীদের শরীরের ৮৫ শতাংশের বেশি দগ্ধ ছিল এবং প্রায় সবারই গুরুতর শ্বাসনালির দগ্ধজনিত ক্ষত ছিল। ১৮ জন দুর্ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে মারা যায়। চিকিৎসা শেষে ৩৭ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায়।
শুধু বন্ধুদের দেখতে আসে : অনেক শিশু এখনো নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলে। তাদের শরীরের ক্ষতের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে গভীর মানসিক ও সামাজিক সংকট।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মেহেরুননেসা এক বছর ধরে আহত শিক্ষার্থীদের পাশে আছেন। হাসপাতালের দিনগুলো থেকে শুরু করে এখনো তিনি তাদের নিয়মিত খোঁজ রাখেন।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এখনো নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। মাঝেমধ্যে শুধু বন্ধুদের দেখতে আসে। কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার চলে যায়। তাদের মুখে হাসি থাকলেও শরীর আর মন এখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
তিনি জানান, সবার শেষে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা আবিদুর রহিম এখনো অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছে। শিক্ষিকা লরিনের মুখ ও দুই হাত এতটাই পুড়ে গেছে যে দুর্ঘটনার পর তাঁর ছোট সন্তান পর্যন্ত তকে চিনতে পারে না। শিক্ষিকা নিশির গলা থেকে বুক পর্যন্ত দগ্ধ হওয়ায় ভবিষ্যতে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন কি না, তা নিয়েও চিকিৎসকদের শঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া রুপি বড়ুয়া, কাফি, সামিয়া, নুসরাত, পায়েল, নিলয়সহ আরো অনেকের শরীরের ক্ষত তাদের স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। নিলয় ও পায়েলের কান অপসারণ করতে হয়েছে। নাবিদ নেয়াজ এখনো গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে।
আগুন শুধু শরীর নয়, মনও পুড়িয়ে দিয়েছে : জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত জাহান তানজিলা বলেন, গুরুতর আহত শিশুদের প্রায় সবার মধ্যেই ট্রমার প্রভাব ছিল। এক বছর পরও অন্তত ৩০ শতাংশ শিশু পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার (পিটিএসডি), উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিস-অর্ডারে ভুগছে।
তিনি বলেন, অনেক শিশু স্কুলে যেতে ভয় পায়, মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না। এমনকি প্রয়োজনীয় ফিজিওথেরাপিও করতে চায় না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্লাস্টিক সার্জন ডা. মৃদুল কান্তি সরকার বলেন, গুরুতর দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার মধ্যেই শেষ হয় না। তিনি বলেন, পোড়া দাগ পরিপক্ব হতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগে। এই সময়ে একাধিক পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার, লেজার থেরাপি, ফিজিওথেরাপিসহ নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হয়।
তাঁর ভাষায়, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সঙ্গে যৌথভাবে রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। তবে সংকটাপন্ন অবস্থায় বিদেশে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কাউকে বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়নি।
স্কুল বলছে, সহায়তা চলছে : মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর হলেও সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ ও পুনর্বাসনের ব্যয় বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিহত শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা সাংবাদিক লিওন মীর বলেন, এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দৃশ্যমান কোনো জবাবদিহি হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অনুদান চাই না। সন্তানের জীবনের মূল্য টাকা দিয়ে হয় না। আমরা চাই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হোক, দায়ীদের বিচার হোক এবং গুরুতর আহত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক।’
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ শামীমের জন্মদিন ছিল ২৯ জুলাই। মারা যায় ২১ জুলাই। দগ্ধ হয়ে আবদুল্লাহ যখন বের হয়, তখন তার শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। সেই অবস্থায়ও সেখানে উপস্থিত মানুষ ভিডিও করছিল।
আবদুল্লাহর মা জুলেখা বেগম বললেন, “কেউ আমার সন্তানকে ধরতে চায়নি। স্কুল থেকে প্রথমে ছেলেকে অটোরিকশায় করে এক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার সময় আব্দুল্লাহ বারবার বলছিল, ‘বাতাস দাও, পানি দাও। হাসপাতাল এত দূরে কেন?’”
তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার মাত্র সাত মাস আগে আবদুল্লাহর বাবা আবুল কালাম সৌদি আরবে মারা যান। অর্থের অভাবে চলতে কষ্ট হয়। অথচ স্কুল থেকে খবর পর্যন্ত নেয় না। আর সরকার থেকে তো কেউ কখনো জানতেই চায় না আমরা কেমন আছি।’
নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নরন নবী বলেন, বিমান দুর্ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক ও কর্মীদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসার প্রয়োজনে বিভিন্ন হাসপাতালে যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মানসিক সহায়তার জন্য তাঁরা নিয়মিত হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে হাসপাতালে গেছেন।
নুরন নবী বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করে যাচ্ছে। হতাহত শিক্ষার্থীদের ভাই-বোনদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব পরিবার চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে এখনো তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



