ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে, যা একই সময়ে প্রতিযোগী রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। শুধু মে মাসেই রপ্তানি কমেছে ১৭ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে কমেছে রপ্তানি পণ্যের গড় মূল্যও, যা দেশের পোশাক খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ৭৫ লাখ ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে প্রায় সব রপ্তানিকারক দেশের ওপর। তবে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বাংলাদেশের ওপর।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ ইইউতে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। মে মাসের হিসাবেও নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ওই মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য হওয়ায় এই পতন দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গত কয়েক মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং ইউরোপের খুচরা বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে নতুন অর্ডারের প্রবাহ কমেছে। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আগের তুলনায় অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও আগে দেওয়া অর্ডারও স্থগিত বা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, গত প্রায় ছয় মাস ধরে বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা আগে অর্ডার দিলেও পরে তা কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা স্থগিত করেছেন। ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা আগের তুলনায় কম দামে পোশাক কিনছেন। ফলে রপ্তানি আয় আরও কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এখন একদিকে কম অর্ডার, অন্যদিকে কম দামের দ্বৈত চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য প্রায় ৬ শতাংশ কমে বর্তমানে ১৯ দশমিক ৭৭ ইউরোতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি একই পণ্যও আগের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি, জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্যের মধ্যে দেশের পোশাক শিল্পের মুনাফার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
ফয়সাল সামাদ আরও বলেন, বাংলাদেশ বলে সব অর্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমানে যে পরিমাণ অর্ডার কমেছে, সেই ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। পাশাপাশি হারানো অর্ডারগুলো অন্য কোনো দেশে চলে গেছে কি না এবং ভবিষ্যতে সেগুলো আবার ফিরে আসবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিযোগী দেশগুলোর চিত্রও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারাও ইউরোপের বাজারে কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো বড় ধাক্কা তাদের কেউই খায়নি। প্রতিবেশী ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রথম পাঁচ মাসে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে কিছুটা রপ্তানি হারিয়েছে। তবে দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। তুলনামূলক কম দামে পোশাক সরবরাহ করে চীন এখনও ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম আরও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করেও দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ, যা বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম পতনের একটি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শুধু কম দামে উৎপাদন করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



