ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ভুয়া, অঘোষিত কিংবা করের আওতার বাইরে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শনাক্ত করতে এবার একাধিক সরকারি সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআর।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তারা ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করলেও বিআইএন গ্রহণ করেনি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং সুবিধা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ করলেও তাদের তথ্য রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত নয়। ফলে প্রকৃত ব্যবসার পরিমাণ নির্ধারণ, করযোগ্য প্রতিষ্ঠান শনাক্ত এবং ভ্যাট আদায়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতেই নতুন এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে জানানো হয়েছে, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু এবং পুরোনো ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈধ বিআইএন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস সংযোগ, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মোটরযান নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়নের ক্ষেত্রেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আসবে। ফলে করের আওতার বাইরে থাকা হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা, তাদের কার্যক্রম এবং কর-ভ্যাট পরিশোধের অবস্থা সম্পর্কে একটি নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে।
সদ্য পাস হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাজেটে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করেছে এনবিআর।
বর্তমানে সারা দেশে প্রায় আট লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিআইএন রয়েছে। তবে এনবিআরের ধারণা, প্রকৃত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তাই চলতি অর্থবছরের মধ্যেই বিআইএনধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। এই লক্ষ্য অর্জনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, বিভিন্ন সেবার সঙ্গে বিআইএন সংযুক্ত করা এবং তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন) সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্প্রসারণ এবং তথ্যভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের আশা করছে সংস্থাটি।
তিনি বলেন, সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাত থেকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট নিবন্ধন বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
এদিকে শুধু প্রশাসনিক সেবাই নয়, আর্থিক খাতেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবায় বিআইএন নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট), স্বল্পমেয়াদি আমানত (এসটিডি) হিসাব, বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বিআইএন অথবা তালিকাভুক্তির প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এনবিআর জানিয়েছে, অর্থ আইন-২০২৬ অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এ নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুসারে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) কিংবা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খুলতে চায়, তাহলে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
একই বিধান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণ, এমএফএস মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ বা নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মোটরযান নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
শুধু নতুন হিসাব বা নতুন সেবার ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমানে পরিচালিত ব্যবসায়িক চলতি হিসাব, এসটিডি হিসাব, ঋণ সুবিধা এবং এমএফএস মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টেও দ্রুত বিআইএন সংযুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তফসিলি ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে এনবিআর।
অর্থবিলে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিআইএন ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে কোনো বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ কিংবা বিদ্যমান সদস্যপদ নবায়ন করতে পারবে না। একইভাবে প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ এবং ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও বিআইএন বাধ্যতামূলক থাকবে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে বিআইএন সংযুক্ত করা হলে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহজেই যাচাই করা যাবে। এতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান, অঘোষিত ব্যবসা এবং কর ফাঁকির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত হওয়ায় নজরদারি কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ দেশের ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। করযোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়বে, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় দ্রুত ও নির্ভুল হবে, ব্যবসায়িক লেনদেনের জবাবদিহি বাড়বে এবং আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সহজ হবে।
তাদের মতে, বিআইএনকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, কর নির্ধারণ, আর্থিক সেবা গ্রহণ এবং সরকারি তদারকি কার্যক্রম আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব আদায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



