ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতিতে একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা রেখে এসেছে। সময়ের পরিবর্তনে তৈরি পোশাক শিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হলেও পাট ও পাটপণ্য এখনো দেশের রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক মন্দার পর অবশেষে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে এ খাত। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত কাঁচামালের সরবরাহ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এ খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। গত তিন অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়। এর আগে টানা চার বছর ধরে এ খাতের রপ্তানি নিম্নমুখী ছিল। ফলে দীর্ঘ সময় পর আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে পাট খাত।
যদিও এ প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক, তবুও করোনা মহামারির সময়কার রেকর্ড এখনো স্পর্শ করতে পারেনি পাট খাত। ২০২০–২১ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি এক লাফে প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সেটিই ছিল গত ১৬ বছরের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়। এরপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে টানা চার বছর ধরে পাট রপ্তানি কমতে থাকে। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে আবারও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, এবারের প্রবৃদ্ধির বড় একটি কারণ কাঁচা পাটের দাম বৃদ্ধি। গত বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার কারণে পাট উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে বাজারে কাঁচা পাটের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে রপ্তানি মূল্যের ওপর। ফলে ডলারের হিসাবে রপ্তানি আয় বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ বা ভলিউমে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়নি।
তাদের মতে, কাঁচা পাটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে শুধু রপ্তানি মূল্য নয়, রপ্তানির পরিমাণও বাড়বে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা বৃদ্ধি, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং উন্নত মানের পাটজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব আঁশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পাটের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের সম্ভাবনাও নতুন করে তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এখনো প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট ছাড়াও পাটের সুতা, পাটের বস্তা এবং বিভিন্ন ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরান।
তবে পণ্যের ধরনভেদে রপ্তানির চিত্র ভিন্ন। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কাঁচা পাটের রপ্তানি মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ কমে ১৩ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। পরিমাণের দিক থেকে এ খাতে আরও বড় পতন হয়েছে। এক বছরে কাঁচা পাট রপ্তানি প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে ১ লাখ ৬৭ হাজার টন থেকে মাত্র ৩৮ হাজার টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ উচ্চমূল্যের কারণে আয় তুলনামূলক কম না হলেও প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছে।
অন্যদিকে পাটের বস্তা ও পাটের সুতা রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অর্থবছরজুড়ে পাটের বস্তা রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পাটের সুতা রপ্তানি প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে সুতার ক্ষেত্রেও পরিমাণের দিক থেকে সামান্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে এবার রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২৮ হাজার টন।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে প্রতি মণ কাঁচা পাট ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। অথচ তার আগের বছর একই পাটের দাম ছিল মাত্র ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। কাঁচামালের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আগে যে পণ্য ১ হাজার ডলারে রপ্তানি হতো, সেটির মূল্য বেড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। তাই ডলারের হিসাবে রপ্তানি আয় বেড়েছে, যদিও পণ্যের পরিমাণ তেমন বাড়েনি।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি অনায়াসে দুই থেকে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রণোদনা, সহজ অর্থায়ন এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে বহুমুখী পাটপণ্যে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাট দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার তুলনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৪৪ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। উদ্যোক্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও পড়েছে। ফলে বহুমুখী পাটপণ্যের অন্যতম বড় বাজার ইইউতে ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
তারা আরও জানান, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়—এমন পণ্যের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি কাঁচা পাটের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন অর্ডার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পাট দিয়ে তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য, শপিং ব্যাগ, জিও-টেক্সটাইল, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক শিল্পের উপকরণ, বাগান পরিচর্যার সামগ্রী, অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব উপাদান এবং প্যাকেজিং শিল্পে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া পাটকাঠি থেকে উৎপাদিত চারকোলেরও আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে চীনের মতো দেশে।
বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম বলেন, পাটের সুতা ও বস্তার ব্যবসায় প্রতি টনে লাভের পরিমাণ খুবই সীমিত। ফলে কাঁচা পাটের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীদের জন্য লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, পাট খাতের প্রকৃত উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারত ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশকেও গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন পণ্য এবং উন্নত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত হলেও এখন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এর আধুনিকায়ন জরুরি। শুধু কাঁচা পাট বা প্রচলিত পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্য সংযোজিত বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামালের স্থিতিশীল সরবরাহ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কার্যকর সরকারি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে পাট খাত আবারও দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হতে পারে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



