ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দেশের অর্থনৈতিক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া আরও বেগবান করতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সংস্থাটির সঙ্গে দ্বিতীয় ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি’ (আরএসএফ) কর্মসূচি বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ও নীতিগত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নতুন এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আদায়ে গতি আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি করা।
সম্প্রতি অর্থ বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যৌথ উদ্যোগে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কয়েকটি ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের প্রাথমিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিতীয় আরএসএফ কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা, শর্তাবলি এবং আগামী ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর অগ্রাধিকার খাতগুলো নিয়ে বিস্তারিত ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আইএমএফের প্রধান শর্ত ও সংস্কারের অগ্রাধিকার
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ধাপের এই কর্মসূচিতে মূলত পাঁচটি বড় খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে সংস্কার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে:
-
বাজারভিত্তিক ও নমনীয় বিনিময় হার: বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং রিজার্ভের ক্ষয়রোধে বিনিময় হারকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ও নমনীয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
-
রাজস্ব আহরণ ও এনবিআরের সংস্কার: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এর অংশ হিসেবে এনবিআরের নীতি নির্ধারণী ও বাস্তবায়ন বিভাগকে পৃথকীকরণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
-
ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতের সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে একটি যৌক্তিক ও টেকসই পর্যায়ে নামিয়ে আনার শর্ত রয়েছে।
-
উন্নয়ন প্রকল্পে দক্ষতা বৃদ্ধি: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করা।
-
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
বাজেট ২০২৭ ও মধ্যমেয়াদি কৌশল
আসন্ন ২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইএমএফের এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে গভীরভাবে আমলে নেওয়া হচ্ছে। বৈঠকে নতুন অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, সরকারি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বিশেষ করে সরকারি খাতের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন নিয়োগ, বেতন-ভাতা এবং পেনশন সংক্রান্ত ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
পে-স্কেল প্রসঙ্গে আইএমএফের অবস্থান: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফ সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কঠিন শর্ত আরোপ করেনি। তবে সংস্থাটি জানতে চেয়েছে—নতুন পে-স্কেল দিতে সরকারের অতিরিক্ত কত টাকা প্রয়োজন হবে এবং সেই অর্থের উৎস বা অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন
দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামাজিক কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত ও একক কাঠামোর আওতায় একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরাসরি ও স্বচ্ছভাবে সহায়তা পৌঁছানো যায় এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়।
নীতিনির্ধারকরা জানান, প্রথম আরএসএফ কর্মসূচির আওতায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশ যে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই দ্বিতীয় পর্যায়ের এই নকশা তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’ (বিসিডিপি)-এর মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক ফান্ড ব্যবহারের কৌশল নতুন কর্মসূচিকে আরও ফলপ্রসূ করবে।
এদিকে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করেই কেবল আইএমএফের নতুন কর্মসূচিতে অংশ নেবে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য শুধু ঋণ বা টাকা পাওয়া নয়, বরং দেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে—এমন কোনো শর্ত আমরা মানব না। প্রথম পর্যায়ের সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমরা এমন একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে যাচ্ছি যা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের মতে, আইএমএফের এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চলমান অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে ভর্তুকি হ্রাস ও করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



