ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্পত্তির হেবা (দান) দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কর পরিশোধ নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্পষ্টীকরণ জারি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উৎসে কর (ট্যাক্স ডিডাক্টেড অ্যাট সোর্স) প্রযোজ্য হবে না। এ ধরনের দলিল নিবন্ধনের সময় শুধুমাত্র দানকর আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী নির্ধারিত হারে দানকর পরিশোধ করতে হবে। তবে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম অনুযায়ী উৎসে করই প্রযোজ্য হবে এবং সেখানে দানকর আরোপ করা হবে না।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এনবিআরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণ জারি করা হয়। সংস্থাটির দ্বিতীয় সচিব (কর আইন-১) মো. একরামুল হক স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনায় নতুন আয়কর আইন ও উৎসে কর বিধিমালার বিভিন্ন বিধান ব্যাখ্যা করে মাঠপর্যায়ের বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এনবিআরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১২৫ ধারা এবং উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে উৎসে কর সংগ্রহের বিধান রয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধনের মাধ্যমে আয়কর আইনের ১২৫ ধারায় নতুন উপধারা (২ক) সংযোজন করা হয়েছে। এই নতুন উপধারায় হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর আদায়ের বিষয়ে পৃথক বিধান রাখা হয়েছে, যা সাধারণ সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান থেকে আলাদা।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, হেবা বা দানের মাধ্যমে কোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনের সময় দানকর আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে দানকর আদায় করবেন সংশ্লিষ্ট নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা। এই কর ই-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ হেবা দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে দানকর পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।
এনবিআর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এই বিশেষ বিধান শুধুমাত্র হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এর বাইরে সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়, বিক্রয় চুক্তি বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এ বিধান কার্যকর হবে না। ফলে সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হারে উৎসে কর সংগ্রহ করা হবে এবং সেখানে দানকর আরোপের কোনো সুযোগ নেই।
সংস্থাটি আরও ব্যাখ্যা করেছে, হেবা বা দানের ক্ষেত্রে সম্পত্তি দানকারীকে দানকর আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে উৎসে কর আরোপের কোনো বিধান নেই। অন্যদিকে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর প্রযোজ্য নয়; বরং নিবন্ধনের সময় কেবল উৎসে করই আদায় করা হবে। অর্থাৎ দুটি ভিন্ন ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য দুটি পৃথক করব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
এনবিআরের মতে, নতুন আয়কর আইন ও বিধিমালার কিছু ভাষাগত অস্পষ্টতার কারণে মাঠপর্যায়ে কর আদায় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছিল। অনেক নিবন্ধন কার্যালয়ে হেবা দলিল নিবন্ধনের সময় দানকরের পাশাপাশি উৎসে করও দিতে হবে কি না—এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, দলিল লেখক, আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেবা ও দানসংক্রান্ত জমি, ফ্ল্যাট এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও নিবন্ধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিতও ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অর্থবিল-২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইনের ১২৫ ধারা সংশোধন এবং পরবর্তীতে আয়কর বিধিমালা, ২০২৬ জারি হওয়ার পর কর আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে নতুন উপধারার বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকায় নিবন্ধন অফিসগুলোতে একেক জায়গায় একেক ধরনের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হচ্ছিল। ফলে হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে গিয়ে অনেক ব্যক্তি অতিরিক্ত কর দিতে হবে কি না—এমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ স্পষ্টীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে হেবা দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং মাঠপর্যায়ে একই নিয়ম অনুসরণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পত্তির হেবা বা দান দলিল নিবন্ধনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার পথও সুগম হবে।
এনবিআর আশা করছে, নতুন এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিবন্ধন কর্মকর্তা, করদাতা, দলিল লেখক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে। ফলে ভবিষ্যতে হেবা ও দান দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কেবল দানকর আদায় করা হবে এবং উৎসে কর আদায়ের প্রশ্ন আর উঠবে না। অন্যদিকে সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হারে উৎসে কর সংগ্রহ অব্যাহত থাকবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



