ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিলামে বিক্রি হওয়া বিপুল পরিমাণ কাপড়বোঝাই দুটি কনটেইনার উধাও হয়ে গেছে। আনুমানিক দেড় কোটি টাকার এই পণ্য দীর্ঘ সাত মাসেও উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে ব্যবসায়ী মহলে। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে দুদকের একটি বিশেষ টিম বন্দরে অভিযান চালাচ্ছে।
চট্টগ্রাম দুদকের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, কনটেইনার উধাওয়ের ঘটনায় তারা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছেন। তার ভাষায়, “ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও গুরুতর। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও রাজস্বের সঙ্গে জড়িত বিষয় হওয়ায় আমরা সরাসরি তদন্তে নেমেছি।”
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলামে ২৭ টন ফেব্রিক্স কেনেন শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা। তিনি নিলামে কাপড়টি কিনেছিলেন ৮৫ লাখ টাকায়। পরে শুল্ক, কাস্টমস চার্জ ও বন্দর সংক্রান্ত খরচ বাবদ আরও এক কোটি সাত লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সব মিলিয়ে তার ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
কিন্তু নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাক নিয়ে কনটেইনার সংগ্রহ করতে বন্দরের ইয়ার্ডে গেলে তিনি চরম বিস্ময়ের মুখে পড়েন। কর্তৃপক্ষ জানান, কনটেইনারটি ইয়ার্ডে নেই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পণ্যের কোনো খোঁজ মিলছে না।
সেলিম রেজা সাংবাদিকদের বলেন, “আমি পুরো অর্থ পরিশোধ করেছি। কিন্তু সাত মাস ধরে আমার পণ্য উধাও। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি এক কোটি টাকার বেশি। কাস্টমসকে বারবার লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
কেবল সেলিম রেজার কনটেইনারই নয়, সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হওয়া আরও একটি কনটেইনারও উধাও হয়ে গেছে। তাতে প্রায় ৪২ লাখ টাকার কাপড় ছিল। অর্থাৎ দুই কনটেইনারে মিলিয়ে দেড় কোটিরও বেশি টাকার পণ্য গায়েব হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিলামের মাধ্যমে সব অর্থ সরকারকে দেওয়ার পরও পণ্য হাতে না পাওয়া ব্যবসার ওপর বড় ধাক্কা। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, বরং ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যাচ্ছে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি।
এই দুই ঘটনায় ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিয়েছেন কাস্টমস ও বন্দরের কাছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোনো ফলাফল না পাওয়ায় এবার দুদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। দুদক বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নেমেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে কনটেইনারগুলো গায়েব হয়েছে।
একজন দুদক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কনটেইনার হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। এটি কেবল অবহেলা নয়, বরং সংগঠিত চুরির মতো শোনাচ্ছে। তদন্তে প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, কাস্টমস নিলামের পণ্য উধাও হওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এভাবে যদি নিলামের পণ্য ব্যবসায়ীদের হাতে না পৌঁছে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়ে যাবে।
এক ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, “এখন যদি নিলামের পণ্য না মেলে, ভবিষ্যতে কে নিলামে অংশ নেবে? এটা বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য মারাত্মক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।”
দুদক জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত শেষে তারা বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করবে। প্রয়োজনে বন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, ইয়ার্ড রেকর্ড ও কাস্টমস ডকুমেন্ট পরীক্ষা করা হবে। কনটেইনার উধাওয়ের সঙ্গে কারা জড়িত, তা বের করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রুত সমাধান না হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



