ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ন্ত্রণাধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার হিসেবে সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুন। ১৯৮৬ সালের ১ নভেম্বর জন্ম গ্রহণ করা এই কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে জালিয়াতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই যেখানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেছেন অনিয়মের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য।রাতারাতি বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক। একজন সাধারণ সরকারি চাকুরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও ঘুষ এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল এই অবৈধ সম্পদের পাহাড় দেখে হতবাক খোদ রাজস্ব প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
সম্প্রতি তার দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে এমনই এক অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে ও অনুসন্ধানে জানা যায়, কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তা অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। কেবল এই এক এলাকা থেকেই তিনি কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্ড ব্যবস্থার বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তিনি পরিচালনা করেন একচেটিয়া লুটপাট। রাজস্ব ফাঁকি আটকানোর নামে তিনি প্রকৃতপক্ষে গড়ে তোলেন ঘুষ আদায়ের এক বিশাল সিন্ডিকেট। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধের নামে অভিযান, প্রিভেনটিভ টিম নিয়ে নাইট টহলের নাটক সাজিয়ে বন্ড ব্যবসায়ীদের জিম্মি করতেন। পরবর্তীতে বন্ড মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ছেড়ে দিতেন ছাড়পত্র। ২০১৮ থেকে ২০২১—এই তিন বছরে অবিভক্ত বন্ডে যেন তার একচ্ছত্র রাজত্ব চলেছিল। বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন বড় অংকের টাকা নেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন মোটা অঙ্কের মাসিক মাসোহারা।
অভিযোগ রয়েছে, রাসেল আল মামুনের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে বড় ভিত্তি ছিল এনবিআরের সাবেক সদস্য এবং তখনকার অবিভক্ত বন্ডের কমিশনার। সেই কমিশনারের সময়ে মোংলা কাস্টম হাউসে রাসেল কাজ করার সময় থেকেই সেই সাবেক কমিশনারের ঘনিষ্ঠ ও মূল আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি পান। মোংলায় কর্মরত থাকাকালে কমিশনারের মূল ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করতেন রাসেল। সেসময় মোংলা কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ভারী আমদানিপণ্যে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিতে সাহায্য করেন এবং নিজে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে সেই কমিশনার অবিভক্ত ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলি হয়ে এলে তিনি রাসেল আল মামুনকেও সেখানে নিয়ে আসেন(২০১৮-২০২১ সালে)। তখন সেই কমিশনার রাসেলের ওপর ন্যস্ত করেন বন্ডের হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেনটিভের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর শাখার দায়িত্ব।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক কারণে কাস্টমসে পরিবর্তন এলেও থামেনি রাসেলের দুর্নীতির চাকা। ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার আবু ওবায়দাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে পুনরায় বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। কমিশনার আবু ওবায়দার বিশেষ অনুগ্রহে এবং তাকে ভুল বুঝিয়ে রাসেল পান আইন শাখা, টঙ্গী ও গুলশান সার্কেলের মতো সবচেয়ে লোভনীয় পদায়নগুলো। পোশাক শিল্পের অন্যতম হাব গুলশান ও টঙ্গীর বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো ছিল রাসেলের জন্য একেকটি ‘সোনার হরিণ’। গুলশানের নামীদামি ওয়্যারহাউসগুলো থেকে প্রতি মাসে তিনি ১ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতেন। অন্যদিকে টঙ্গী সার্কেলের বড় বড় বন্ড প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উঠত আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাসিক মাসোহারা। নথিপত্র বা ফাইল আটকে রাখা, অডিটের ভয় দেখানো এবং ভুয়া তদন্ত রিপোর্ট তৈরির ভয় দেখিয়ে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একাই পুরো উত্তর বন্ড শাসন করেছেন।
রাসেলের এই অপকর্ম ও দুর্নীতির শত শত প্রমাণের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো বন্ড কমিশনারেটে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের অডিট করার জন্য রাসেল আল মামুন ৩৫ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করেন। অডিটের নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করার কথা থাকলেও, বিপুল পরিমাণ ঘুষ নিয়ে তিনি কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অডিট ছাড়াই ফাইলটি সম্পূর্ণ অনুমোদন দিয়ে ছেড়ে দেন। অর্থাৎ, সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি করে নিজের পকেট ভারী করেন। তবে বিষয়টি গোপন থাকেনি। একটি পক্ষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কমিশনার ওবায়দা বাধ্য হয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই নিরপেক্ষ কমিটির নতুন তদন্তে থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে আসে এবং প্রকাশ পায় যে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছিল, যা রাসেল টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দিয়েছিলেন। কিন্তু এত বড় জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও কমিশনারের ডানহাত এবং গোপন অপকর্মের সহযোগী হওয়ায় রাসেলের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং তাকে বহাল রাখা হয়েছে একই পদে।
রাসেল আল মামুনের দুর্নীতির বিস্তার কেবল বন্ড কমিশনারেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না; কমলাপুর আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) কাস্টম হাউসেও তিনি চালিয়েছেন সমান্তরাল রাজত্ব। আইসিডিতে থাকাকালে কনটেইনারের মাধ্যমে আনা আমদানিকৃত শেড ও মালামাল খালাসের বিনিময়ে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের জিম্মি করতেন তিনি। প্রতি মাসে সেখান থেকে অনায়াসে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করতেন। কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা ঠুকে দেওয়া কিংবা চালান চিরতরে আটকে দেওয়ার হুমকি দিতেন। তৎকালীন আইসিডি কমিশনার ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ভুক্তভোগী একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রাসেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে এবং বিপুল অর্থের প্রভাবে প্রতিবারই পার পেয়ে যান এই কর্মকর্তা।
ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল অর্থ রাসেল আল মামুন রিয়েল এস্টেটসহ নানা অবৈধ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। সরকারের আয়কর বিবরণীতে তিনি যে সামান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন, বাস্তবে তার আসল সম্পদের পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। একজন সরকারি চাকরিজীবীর সীমিত বেতন দিয়ে এত সম্পদের মালিক হওয়া আইনত ও মানদণ্ড বিচারে অসম্ভব। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে তার নিজ গ্রামে তিনি নির্মাণ করেছেন প্রাসাদসম বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ। নামে-বেনামে রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় কিনেছেন একাধিক প্লট, আলিশান ফ্ল্যাট ও একাধিক গাড়ি। নিজের কালো টাকা লুকাতে তিনি কৌশলে বাবা-মা, ভাইবোন ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের নামে কেনাবেচা করেছেন বিপুল সম্পত্তি। কেবল তার গ্রাম ও আত্মীয়দের নামে থাকা সম্পদের সুনির্দিষ্ট তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল।
ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি এই কাস্টমস কর্মকর্তার। অতিরিক্ত অর্থ ও ক্ষমতার দম্ভে উশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত রাসেলের সাথে তার স্ত্রীর বনিবনা হচ্ছিল না। একপর্যায়ে তার নির্যাতনের শিকার হয়ে স্ত্রী বাধ্য হয়ে আদালতে রাসেলের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, টাকার প্রভাবে মামলাগুলোর কার্যক্রম ঝুলিয়ে রেখে বর্তমানেও তিনি বহাল তবিয়তে আলিশান জীবনযাপন করে যাচ্ছেন।
এদিকে এই কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তার বিষয়ে তার গ্রামের বাড়ি গফরগাঁতে খোজ নিলে জানা যায়, আগে কিছুই ছিলো না এই কর্মকর্তার। ছিলো না একটু মাথা গোজার ঠাঁই। টিনের বাড়িতে বসবাস করা রাসেল এখন গ্রামের বিশাল বিত্তশালী। কিনেছেন গ্রামে শতশত শতাংশ জমি। এমনকি গ্রামে দানবীর নামেও এখন তিনি বেশ পরিচিত।
এসব বিষয়ে জানতে সম্প্রতি প্রমোশন পেয়ে সহকারি কমিশনার রাসেল আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাবার্তাকে বলেন, আমি কোন দুর্নীতি করিনি। তখন প্রশ্ন করা হয় সম্প্রতি উত্তরবন্ডে একটি প্রতিষ্ঠানের ফাইল অডিট না করে রিপোর্ট প্রদান করা এবং পরিবর্তীতে ফাঁকি তদন্ত টিম উদঘাটন করেছে এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো আমাদেরই অফিস করেছে। তাহলে আপনি বা আপনার টিম কোন ফাঁকি কেন পেল না। এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দেখা করে সব বলবেন। এরপর এই প্রতিবেদককে নিউজ না করার জন্য অনুরোধ করেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া নতুন কিছু না। এটা পুরাতন বিষয়। কিন্তু বিষয় হচ্ছে, এগুলো যারা মনিটরিং করবে তারা ঠিক মতো দেখে না। যদি দেখতো তাহলে কেউ দুর্নীতি করার সাহস পেতো না।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাবার্তাকে বলেন, গত সরকার দুর্নীতির লাগাম টানতে পারেনি। এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি রোধ করা। সরকারি যেকোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেটা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহু। এগুলো হয় কারণ দুদক বা এনবিআর ঠিকমতো দেখে না। আমি মনে করি, এখন এগুলোতে জোর দিতে হবে। দুর্নীতি প্রমাণ হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে করে ব্যবস্থা নিলে রাজস্ব আহরণে গতি বাড়বে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



