ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে এবং এক ট্রিলিয়ন (১ হাজার বিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতির ঐতিহাসিক চূড়ায় পৌঁছানোর একটি সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই সুবিশাল লক্ষ্য অর্জন কেবল অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়, বরং এর জন্য বিশাল অংকের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) অপরিহার্য। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তির বৃহৎ ও কৌশলগত বিনিয়োগ বাংলাদেশের এই পথচলাকে অনেক বেশি গতিশীল করতে পারে। আর সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশে একটি নিরাপদ, আন্তর্জাতিক মানের, সুগম এবং সর্বতোভাবে বিনিয়োগ-বান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের এক উচ্চপর্যায়ের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আয়োজিত একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ সদস্যের এক বিশাল ও প্রভাবশালী বাণিজ্য প্রতিনিধিদল বর্তমানে বাংলাদেশ সফরে রয়েছে। প্রতিনিধিদলটির যৌথ নেতৃত্বে ছিলেন ইউএস চেম্বার অব কমার্সের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও চিফ অব স্টাফ প্যাট্রিক পিটস এবং ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের ইভেন্ট সমন্বয়ের প্রধান দেবী চ্যাটার্জি। মন্ত্রী জানান, প্রতিনিধি দলটিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন খাতের বিশ্বখ্যাত জায়ান্ট ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো পেমেন্ট নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী মার্কিন কোম্পানির উর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। উল্লেখ্য, এই দলে এমন সব প্রতিনিধিও ছিলেন যাদের মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের উদীয়মান বাজারে দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে সফলতার সঙ্গে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। বৈঠকে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান উদীয়মান অর্থনীতিতে তাদের বিদ্যমান পুঁজি আরও বাড়াতে এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে রূপান্তরের ঐতিহাসিক যাত্রায় এক সক্রিয় ও শক্তিশালী অংশীদার হতে গভীর আগ্রহ ও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের আগামী দিনগুলোর সার্বিক বাণিজ্য নীতি, নতুন রপ্তানি নীতি, ডিজিটাল অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স খাতের নীতি কাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোচনার জবাবে মন্ত্রী মার্কিন প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করে বলেন, দেশের সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে সরকার বর্তমানে টেকসই ৮ শতাংশ রিয়েল জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে। এই লক্ষ্য পূরণে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সার্বিক বিনিয়োগ-সহায়ক আধুনিক নীতি প্রণয়ন করাকে অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের নিজস্ব রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেবল তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি ঝুড়ি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় করার কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনাময় খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে। এর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে:
-
জুট (পাট) শিল্প: পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে পাটের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
-
লেদার (চামড়া) শিল্প: বিশ্বমানের চামড়াজাত পণ্য তৈরি ও মানোন্নয়ন।
-
শিপ রিসাইক্লিং (জাহাজ ভাঙা) শিল্প: নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিশ্বমানের গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে তোলা।
এই খাতের ব্যবসায়িক ভিত্তি মজবুত করে এদেরকে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রপ্তানি খাতে রূপান্তর করার জন্য সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু নীতিগত সংস্কার ও উন্নয়নমূলক বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রী ঘোষণা দেন, সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর এই রূপরেখা ও পরিকল্পনা আগামী মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে সবার উদ্দেশ্যে সার্বজনীনভাবে প্রকাশ করা হবে। তাছাড়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় খুব শীঘ্রই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন সংক্রান্ত কৌশলগত আলোচনা ও বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে বলেও মার্কিন বাণিজ্য দলকে অবহিত করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের অপার সম্ভাবনা ও তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধার কথা উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের লক্ষাধিক আইটি ফ্রিল্যান্সার এবং সফটওয়্যার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করতে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ব্যাপক বিশেষ সংস্কার ও উদারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে দেশীয় আইটি পেশাজীবীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই অত্যন্ত সহজ ও নিরাপদ উপায়ে বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে সরাসরি টাকা গ্রহণ ও লেনদেন করতে পারবেন। একইসঙ্গে, দেশের কৃষিখাতের বিপুল প্রাকৃতিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষি-প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে নতুন আধুনিক নীতি প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রে নানা পদ্ধতিগত জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ (Ease of Doing Business) কোনো একক বা তাৎক্ষণিক অলৌকিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক, দীর্ঘমেয়াদী ও গতিশীল প্রক্রিয়া যা মূলত ট্রায়াল অ্যান্ড এরর এবং ক্রমাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি নতুন ব্যবসা শুরু ও পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যে একাধিক দপ্তর থেকে লাইসেন্স, ছাড়পত্র, নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) ও পারমিট নিতে হয়—যেখানে ব্যাপক জটিলতা ও কাজের ওভারল্যাপিং বিদ্যমান—তা দূরীকরণে কাজ চলছে। অপ্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী নয় এমন শর্তাবলি নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
এই যুগান্তকারী সংস্কারের সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহের যাবতীয় হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা পুরোপুরি নির্মূল করতে একটি একক ও সমন্বিত ডিজিটাল পোটাল চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও রূপরেখা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদগুলো সম্পূর্ণ পৃথক ও বিচ্ছিন্নভাবে তাদের নিজস্ব অধিক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করে থাকে। কিন্তু অতি শীঘ্রই সরকার একটিমাত্র কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল চালুর মাধ্যমে সারা দেশের যেকোনো প্রান্তের জন্য সব ধরনের ট্রেড লাইসেন্স আবেদন এবং ইস্যু করার প্রক্রিয়া এক ছাতার নিচে নিয়ে আসছে।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী এর অসামান্য কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ঠাকুরগাঁওয়ের কোনো স্থানে বাণিজ্যিক ঠিকানা বা শাখা রয়েছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ঢাকার একজন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী চাইলে ঢাকায় নিজের কার্যালয় বা বাড়িতে বসে এই ডিজিটাল পোর্টালে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড ও নির্ধারিত ফি অনলাইনে জমা দিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে তার ট্রেড লাইসেন্সটি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। এর জন্য কোনো ব্যবসায়ীকে কোনো সরকারি বা স্থানীয় লাইসেন্স প্রদানকারী কার্যালয়ে সশরীরে এক পা-ও ফেলতে হবে না। ব্যবসায়ী সমাজ খুব শীঘ্রই এই আধুনিক ও বৈপ্লবিক ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতিফলন বাস্তবে দেখতে পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



