ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ সরকারের কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্বাহী পর্ষদের সভায় এ সংক্রান্ত শর্ত থেকে অব্যাহতি চাইতে হবে। যদিও চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় অন্যান্য প্রায় সব শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশ নেবেন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সেখানে শুধু ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ কিস্তি ছাড়ের সম্ভাবনা, অব্যাহতি প্রাপ্তির যৌক্তিকতা এবং অতিরিক্ত শর্ত এড়ানোর কৌশল নিয়েও আলাপ হবে। সম্মেলনের পরপরই আইএমএফ নির্বাহী পর্ষদ বৈঠকে বসবে, যেখানে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
অন্যদিকে, আইএমএফের ডেভেলপমেন্ট মাইক্রো ইকোনমিক্স বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকা সফরে আসছে। দুই সপ্তাহব্যাপী এ সফরে তারা ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের আগে বাংলাদেশের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করবে। প্রায় ৮০ কোটি ডলারের এই কিস্তি ছাড়ের পূর্বশর্ত হিসেবে তারা কর আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া পরিশোধ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো খতিয়ে দেখবে। এ সময় তারা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে।
গত ২৬ জুন বাংলাদেশ চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ১৩৪ কোটি ডলার ছাড় পেয়েছে। একই সময়ে আইএমএফ একটি কান্ট্রি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে পরবর্তী কিস্তি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সামনে ৩৩টি শর্ত তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ২১টি কাঠামোগত শর্ত এবং ১২টি পরিমাণগত শর্ত ছিল, যা কর্মক্ষমতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। আইএমএফের নিয়ম অনুযায়ী কর্মক্ষমতার মানদণ্ড বাধ্যতামূলক; এগুলো পূরণ না হলে অব্যাহতি চাইতে হয় এবং নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদন নিতে হয়।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী গত জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এটি কর্মক্ষমতা মানদণ্ডের আওতাধীন হওয়ায় বাধ্যতামূলকভাবে পূরণ করতে হতো। অথচ অন্যান্য পাঁচটি সূচক নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে বাংলাদেশ সক্ষম হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, অথচ বাস্তবে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার—যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। একইভাবে সরকারের স্থানীয় বকেয়ার পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও বাজেট ঘাটতিও নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে। তাছাড়া কাঠামোগত শর্তের মধ্যে যেমন ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ জারি, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে নতুন সংস্থা গঠনসহ বহু পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজস্ব ঘাটতি ছাড়া প্রায় সব সূচকেই বাংলাদেশ অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকায় বাংলাদেশ রাজস্ব আদায়ের ব্যর্থতার বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষি করার সুযোগ পাবে। তবে যেহেতু এটি কর্মক্ষমতা মানদণ্ডের আওতায় পড়ছে, তাই কিছুটা সমস্যায় পড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, বিনিময় হার এখন বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ডলার কিনছে। আইএমএফ এই বিষয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। যদিও আগের মতো সরাসরি বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি থাকলেও এটি বাংলাদেশকে ঋণ কিস্তি থেকে বঞ্চিত করবে না। কারণ প্রায় সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে, আর কিছু শর্ত যৌক্তিক ব্যাখ্যা সাপেক্ষে মিশন কর্মকর্তারাই নিষ্পত্তি করতে পারেন। তবে কর্মক্ষমতা মানদণ্ডের শর্ত মিশন স্তরে নিষ্পত্তি হয় না, এজন্যই নির্বাহী পর্ষদে অব্যাহতি চাইতে হয়। ইতোমধ্যে রিজার্ভ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণে দুই-তিনবার অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে। বারবার অব্যাহতি চাওয়াটা সরকারের জন্য কিছুটা বিব্রতকর হলেও এটি ঋণ প্রাপ্তির পথে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ষষ্ঠ কিস্তির ক্ষেত্রে কর রাজস্ব আদায় বাধ্যতামূলকভাবে পূরণের শর্ত ছিল। তাই এখানে ব্যর্থ হওয়ায় আইএমএফকে রাজি করাতে হবে কেন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা পূরণ করা হবে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমদানি কমে যাওয়া, রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির প্রায় সব শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হলেও রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই ঘাটতি মেটাতে বা অন্তত অব্যাহতি পেতে ওয়াশিংটনে আসন্ন বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রবাহের ধারাবাহিকতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



