ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিজস্ব গবেষণা ও সুনির্দিষ্ট অডিট তদন্তে কর ফাঁকির ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়েছে। কর আদায় ফাঁকি এবং ভুয়া তথ্যপ্রদানের অভিযোগে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী আমলা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ মোট ৩২ জনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ফৌজদারি মামলা দায়েরের কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশেষ তদন্তকারী শাখা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল’ (সিআইসি)-এর দীর্ঘ ও নিবিড় অনুসন্ধান শেষে প্রস্তুতকৃত সার্বিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ আইনানুগ সুপারিশমালা চূড়ান্ত করা হয়।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সিআইসির প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, রিটার্ন নথি, ব্যাংকিং লেনদেন এবং ঘোষিত ও অঘোষিত সম্পত্তি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে তাদের প্রকৃত আয় গোপন রেখে ও অসংগতিপূর্ণ হিসাব দাখিল করে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন।
ইতোমধ্যে এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর এলাকার ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন কর অঞ্চল এবং ঢাকার বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে (এলটিইউ) অতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিক আদেশ সংবলিত চিঠি পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে কঠোর বার্তা প্রদান করে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করে অবিলম্বে ফৌজদারি বিধিতে মামলা রুজু করতে হবে।
তালিকায় যেসব হাইপ্রোফাইল মুখ
সিআইসির প্রস্তুতকৃত আসামির তালিকায় জায়গা পেয়েছেন দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনের হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন—
-
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান (সালমান ফজলুর রহমান)
-
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান
-
ঢাকা ওয়াসার দীর্ঘমেয়াদী সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান
-
সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক
-
আওয়ামী লীগের সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক
-
সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও বিশিষ্ট অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর
এ ছাড়া তালিকায় কয়েকজনের রাজনৈতিক কিংবা পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে। এদের মধ্যে মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ, জাহাঙ্গীর আলম, সৈয়দা আরজুমান বানু ও আরিফা জেসমিন অন্যতম। গণমাধ্যম ব্যক্তিদের মধ্যে তালিকায় উঠে এসেছে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের পরিচিত মুখ ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমদের নাম।
৯ জনকে ‘পলিটিক্যাল এক্সপোজড পারসন’ হিসেবে শনাক্তকরণ
তালিকাভুক্ত উল্লিখিত ৩২ জন করদাতার মধ্যে ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ‘পলিটিক্যাল এক্সপোজড পারসন’ বা পিইপি (PEP) হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নীতি অনুসরণ করে এমন ব্যক্তিদের পৃথক শ্রেণিভুক্ত করা হয়ে থাকে। পিইপি বলতে মূলত রাষ্ট্র, সরকার বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চপদে আসীন বা পূর্বে দায়িত্ব পালনকারী প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গকে বোঝায়।
কর্মকর্তারা জানান, যেহেতু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে কর ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির অর্থ পাচার ও ঘুষ গ্রহণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন, সেহেতু তাঁদের আয়-ব্যয়ের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসারেই এ তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে।
সামিট পরিবারের ওপর নজিরবিহীন আইনি চাপ
সিআইসির প্রতিবেদনে কর ফাঁকির অভিযোগে ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর মধ্যে সামিট গ্রুপের ওপর নজরদারি সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। সামিট গ্রুপের সর্বেসর্বা মোহাম্মদ আজিজ খানের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে অভিযুক্তের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় নাম রয়েছে:
-
আনজুমান আজিজ খান
-
আয়েশা আজিজ খন্দকার
-
আজিজা আজিজ খান
-
আদিবা আজিজ খান
এ ছাড়াও সামিট গ্রুপের ব্যবসায়িক ও আর্থিক কাঠামোর সাথে যুক্ত অন্যান্য ব্যবসায়ী ও অংশীদারদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ নোটিশ ও মামলার আদেশ নির্দেশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মাদ লতিফ খান, মোহাম্মাদ ফরিদ খান, জাফর উদ্দিন খান এবং মো. ফয়সাল করিম খানের নাম রয়েছে। তালিকায় অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তার মধ্যে যুক্ত হয়েছেন এ এস এফ রহমান, মেজর (অব.) সাইফুল আলম, মো. শাহরিয়ার আলম ও শামীম আরা জাহান।
আয়কর আইনের কঠোর ধারায় কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান
এনবিআরের জারি করা চিঠিতে সাতজন সুনির্দিষ্ট করদাতার বিরুদ্ধে সরাসরি আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৩১২ এবং ৩১৩ ধারার আওতায় নালিশি মামলা ঠুকে দেওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। এই সাতজন অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন— ১. নজরুল ইসলাম মজুমদার ২. মো. নূরুল আবছার ৩. মো. জিয়াউর রহমান ৪. মো. নূরুল আলম ৫. নাসিরউদ্দীন মো. সেলিম ৬. মোস্তাক মিয়া ৭. বিদারুল ইসলাম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে আয়কর আইনের ৩১২ ধারাটি অত্যন্ত কঠোর। এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তি যদি আয় গোপন করে কর ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে প্রমাণিত হন, তবে তাঁকে শুধু বকেয়া অর্থদণ্ড প্রদান করলেই চলবে না; বরং সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। কোনোভাবেই এই কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাসের কম করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে ৩১৩ ধারাটি মূলত ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে তৈরি করা হয়েছে। কোনো করদাতা যদি রিটার্নে মিথ্যা তথ্য, ভুল ব্যাংক হিসাব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে আইনের ৩১৩ ধারা অনুসারে তাঁকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও নথি নিষ্পত্তির দ্রুত তাগিদ
এনবিআরের মাঠপর্যায়ের অফিসগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরসহ দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক জোনের অধীন একাধিক ট্যাক্স সার্কেল বা অফিসে এসব হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির টিআইএন (TIN) নথি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশের পর এই সবগুলো নথি ও অডিট রিপোর্ট দ্রুত একত্রিত করা হয়েছে। সিআইসির সুপারিশকৃত তালিকায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম, সুনির্দিষ্ট টিআইএন নম্বর, কর ফাঁকির সম্ভাব্য পরিমাণ এবং ফাঁকির ধরণ বিস্তারিত উল্লেখ করে মামলার অনুচ্ছেদ প্রস্তুত করা হয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রয়োজনীয় সকল আইনি ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিটি কর অঞ্চলের উপ-কর কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক আদালতে লিখিত নালিশ বা মামলা দায়ের করে কমিশনকে অবহিত করতে। দেশের রাজস্ব খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর ফাঁকির প্রবণতা চিরতরে বন্ধ করতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে এনবিআর সূত্রে জানানো হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



