ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে প্রতিবছর কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ বেড়েই চলছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই খাতে দেশীয় বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারের পক্ষ থেকে শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হলেও নতুন কোনো দেশি উদ্যোক্তা এখনো সামনে আসেনি। ফলে দেশের এই লাভজনক ব্যবসাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশি কোম্পানিগুলো।
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বন্দরে মোট ২২ লাখ ৩৭ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৬৯ হাজার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণে কনটেইনার পরিবহন খাতের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, দেশি উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দেশের কনটেইনার পরিবহন খাতে একমাত্র বড় ধরনের দেশি বিনিয়োগকারী হলো কর্ণফুলী গ্রুপ। তারা ২০২০ সাল থেকে এই ব্যবসায় নাম লিখিয়েছে এবং বর্তমানে তাদের বহরে আটটি কনটেইনার জাহাজ রয়েছে। এত বড় বহর থাকার পরও নতুন কোনো দেশি উদ্যোক্তা এই খাতে আসতে সাহস করেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিপিং খাতে বিনিয়োগে ঝুঁকি অনেক বেশি এবং মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণও বিপুল হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখনো পিছপা। এর ফলে পুরো খাত বিদেশি কোম্পানির করায়ত্ত হয়ে পড়েছে।
শিপিং কোম্পানি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩৪১টি কোম্পানি কনটেইনার পরিবহন খাতে ব্যবসা করেছে। এর সবকটিই বিদেশি কোম্পানি। তারা কেউ সরাসরি বাংলাদেশে অফিস খুলে, আবার কেউ এজেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা করছে। বিশ্বের শীর্ষ কনটেইনার পরিবহন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ বাজারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ডেনমার্কভিত্তিক মায়ার্সক লাইন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি), ফ্রান্সভিত্তিক সিএমএ–সিজিএম। এছাড়া জার্মানির হ্যাপাগ লয়েড, জাপানের ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস (ওয়ান), চীনের কসকো, হংকংয়ের এসআইটিসি কনটেইনার লাইন এবং ওরিয়েন্ট ওভারসিস কনটেইনার লাইনও সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি কোম্পানিগুলো তিনভাবে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
-
প্রথমত, তারা শিপিং কোম্পানির কাছে কনটেইনার ভাড়া দেয়। ২০ ফুট লম্বা একটি কনটেইনার থেকে দিনে আড়াই থেকে পাঁচ ডলার পর্যন্ত আয় হয়।
-
দ্বিতীয়ত, কিছু কোম্পানি নন–ভেসেল অপারেটিং কমন ক্যারিয়ার (NVOCC) হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের কোম্পানি নিজের কনটেইনারের পাশাপাশি ভাড়া নেওয়া কনটেইনার পরিচালনা করে। তারা আমদানি–রপ্তানিকারকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে পণ্য পৌঁছে দেয় এবং পুরো শিপমেন্টের ব্যবস্থাপনাও করে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০–৩৫টি বিদেশি কোম্পানি NVOCC হিসেবে কাজ করছে।
-
তৃতীয়ত, মেইন লাইন অপারেটর (MLO) হিসেবে কিছু কোম্পানি নিজস্ব জাহাজে নিজেদের কনটেইনার ব্যবহার করে। এই ক্ষেত্রে তারা পরিবহনভাড়ার পুরো আয় নিজেরাই পায়।
দেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকার ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কনটেইনার আমদানিতে বিশেষ শুল্কছাড় ঘোষণা করে। সাধারণ কনটেইনার আমদানিতে মোট করভার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। একইভাবে হিমায়িত পণ্য পরিবহনের কনটেইনারে শুল্ক ৩১ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা হয় ২০ শতাংশে।
তবে এই শুল্কছাড় কোনো বাস্তব ফল বয়ে আনেনি। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোট ৫১৭টি কনটেইনার আমদানি হয়েছে, আর তার আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৬৭৮টি। এসব কনটেইনার মূলত আমদানি হয়েছে বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষায়িত পণ্য পরিবহনের জন্য। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য কোনো কনটেইনার আমদানি করা হয়নি। ফলে বাণিজ্যিক কনটেইনার পরিবহন খাত দেশি উদ্যোক্তাহীন অবস্থায় রয়ে গেছে।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিপিং খাতে বিনিয়োগে প্রথম ধাপেই হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় প্রয়োজন হয়। শুধু জাহাজ কেনা নয়, কনটেইনার, মেরামত সুবিধা, বন্দরের ফি, আন্তর্জাতিক বীমা এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মিলিয়ে পুরো খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক বড়। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে এই খাত দখল করে রেখেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকছে। দেশি উদ্যোক্তা না থাকায় পরিবহনভাড়ার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার উপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিপিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশি উদ্যোক্তাদের সামনে আনতে হলে শুধু শুল্কছাড় নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা। উদাহরণস্বরূপ—বিনিয়োগ ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার জন্য সরকারি গ্যারান্টি, ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা, এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক রুটে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে কনটেইনার পরিবহনের চাহিদা আরও দ্বিগুণ হতে পারে। তাই দেশি উদ্যোক্তাদের এখনই এই খাতে এগিয়ে না আসলে, পুরো ব্যবসা বিদেশি কোম্পানির হাতে একচেটিয়া হয়ে যাবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



