ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮০তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী এই সফরে তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বই করেননি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ পথচলাকে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। নিউইয়র্ক সফরে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের ৬ জন নেতা এবং উচ্চ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে ছিলেন। দীর্ঘদিন পর এ ধরনের একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিনিধি দলের বিদেশ সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ড. ইউনূসের এই সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণ, বিভিন্ন বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকা তুলে ধরা এবং নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্জন স্থান পায়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শুক্রবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে এই সফরের উল্লেখযোগ্য ছয়টি সাফল্যের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন। নিচে প্রতিটি সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
১. গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির বার্তা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশের জনগণকে তাদের প্রকৃত ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—প্রধান উপদেষ্টার সফরে বাংলাদেশের ছয়টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি একসঙ্গে অংশগ্রহণ করা। অতীতে বিদেশ সফরে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের এমন সমন্বিত উপস্থিতি দেখা যায়নি। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বাংলাদেশ এবার সত্যিকারের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে ঐক্যবদ্ধভাবে এগোচ্ছে।
এই সফরে প্রতিনিধিরা শুধু কূটনীতিকদের সঙ্গেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দ, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেন।
২. বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপ
ড. ইউনূস সফরকালে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যেখানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, মানব উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচিত হয়।
তিনি ইতালি, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, আলবেনিয়া, কসোভো ও ভুটানের রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অগ্রগতি, রাজনৈতিক রূপান্তর ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগগুলো সামনে তুলে ধরা হয়।
এছাড়া তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্দি, ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত এক নৈশভোজে যোগ দেন। সেখানে বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পান তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশেষ দূতের সঙ্গেও আলোচনা করেন, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্বকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
৩. রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক নেতৃত্ব
সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকট। ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসনীয় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এক মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে নজির স্থাপন করেছে।
তবে এই সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ওপর জোর দেন তিনি। জাতিসংঘ ও দাতা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তিনি নতুন করে বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য ৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি আদায় করতে সক্ষম হন তিনি। এই অর্থ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় প্রকল্পে ব্যয় হবে।
৪. এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে জাতিসংঘের স্বাধীন মূল্যায়ন আমন্ত্রণ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে। এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে ড. ইউনূস জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন—তারা যেন বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন করেন।
এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক যাত্রাপথ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের কাছে জবাবদিহিতা করতে প্রস্তুত।
৫. নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো ও কর্মসংস্থানের সুযোগ
সফরে শ্রম অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির বিষয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। ড. ইউনূস কসোভো, আলবেনিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে বাংলাদেশি শ্রমশক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করবে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে দেশের বেকারত্বও কমবে।
৬. সহযোগিতামূলক ভবিষ্যতের ভিশন
সবশেষে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ড. ইউনূসের অংশগ্রহণ এবং সফরের বিভিন্ন কার্যক্রম বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এ দেশ একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অংশীদার, যা গণতন্ত্র, মানবিক সংহতি ও গঠনমূলক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপ, রোহিঙ্গা সংকটে নতুন অর্থ আদায়, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন, নতুন শ্রমবাজারের সম্ভাবনা এবং সহযোগিতামূলক ভবিষ্যতের ভিশন—সব মিলিয়ে এই সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



