ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৬০০ থেকে ৬৫০ কোটি ডলারের একটি নতুন ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। ডিসেম্বরের মধ্যে এ চুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতেই মিলতে পারে প্রথম কিস্তির অর্থ।
সদ্য ঢাকা সফর করা আইএমএফ প্রতিনিধিদল রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতের দ্রুত সংস্কারসহ পাঁচ বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে। তবে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে একবারে কঠিন শর্ত চাপানোর বদলে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১২-১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে। ৫ দিনের সফর শেষে দলটি বৃহস্পতিবার ঢাকা ত্যাগ করে। এ সময় তারা অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, আগের কর্মসূচির তুলনায় এবার বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি সরকার। একই সঙ্গে কয়েকটি কঠোর শর্ত বাস্তবায়নে সময় ও নমনীয়তা চাওয়া হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, নির্বাচিত সরকার হিসাবে জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হতে পারে। এরপর নভেম্বরে ঢাকায় আরেকদফা বৈঠকের পর ডিসেম্বরে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠকে সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ, ভর্তুকি, সরকারি ব্যয়, নতুন পে-স্কেল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন ও ভবিষ্যৎ সংস্কার রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির ভিত্তি কী হবে, সে বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগে চিহ্নিত নীতিগত বিষয়গুলোর ওপরই কর্মসূচি দাঁড়াবে। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের ভিত্তিতেই অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন হবে। অন্তর্বর্তী কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে।
চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.৫ শতাংশ : বিবৃতিতে আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এসব চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও সংকুচিত করেছে।
সংস্থাটি বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি ও বিচক্ষণ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে, ভর্তুকি যৌক্তিক করতে হবে এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে বিশ্বাসযোগ্য কৌশল নিতে হবে। ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শও দিয়েছে আইএমএফ। প্রতিনিধিদলের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশেরও নিচে চলে যেতে পারে।
পাঁচ বিষয়ে কড়া বার্তা : ঢাকা ছাড়ার আগে আইএমএফ মূলত পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলো হলো-রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সরকারের ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানো ও ব্যাংকিং খাতের দ্রুত সংস্কার। সংস্থাটির মতে, প্রবাসী আয় ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত রাজস্ব আহরণ অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসাবে রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়ন। শুধু ঋণ পাওয়া নয়, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। আইএমএফ যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সংস্কার পিছিয়ে গেলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ-সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুমোদিত ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি কার্যত আর এগোচ্ছে না। পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ নতুন করে একটি কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইএমএফের সঙ্গে একটি নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে কর্মসূচির মূল শক্তি হবে সংস্কারের বাস্তবায়ন। রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর না করলে শুধু ঋণ অর্থনীতির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



