ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে ধারাবাহিক সাফল্য, আধুনিক বহর, সময়নিষ্ঠ সেবা এবং আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। প্রতিষ্ঠার এক যুগ পূর্ণ করে প্রতিষ্ঠানটি এখন ১৩তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে বারো বছরের সফল যাত্রা সম্পন্ন করে নতুন পথচলার সূচনা করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই এয়ারলাইন্স। এক যুগপূর্তি উপলক্ষে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স তাদের সকল যাত্রী, শুভানুধ্যায়ী, ব্যবসায়িক অংশীদার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল এজেন্ট, ট্যুর অপারেটর এবং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
২০১৪ সালের ১৭ জুলাই মাত্র একটি ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজ দিয়ে ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ছোট পরিসরের সেই যাত্রা আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি এয়ারলাইন্সে। বর্তমানে ইউএস-বাংলার বহরে রয়েছে মোট ২৫টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি এয়ারবাস এ৩৩০-৩০০, নয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে পরিচালিত ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ ও এটিআর সিরিজের উড়োজাহাজ। যাত্রা শুরুর পর থেকে সময়নিষ্ঠ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলা একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত তাদের অন-টাইম ফ্লাইট পরিচালনার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি, যা দেশের বিমান পরিবহন শিল্পে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইউএস-বাংলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, সৈয়দপুর এবং রাজশাহী রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগকে আরও গতিশীল করতে এসব রুটে আধুনিক উড়োজাহাজের মাধ্যমে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে ইউএস-বাংলা।
অভ্যন্তরীণ রুটে সফলতা অর্জনের পর আন্তর্জাতিক আকাশেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় ইউএস-বাংলা। ২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে কলকাতা, চেন্নাই, মালে, মাস্কাট, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, জেদ্দা, রিয়াদ, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এবং চীনের গুয়াংজুতে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের মধ্যে ১৫টি নতুন প্রজন্মের বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ নেক্সট জেনারেশন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে ইউএস-বাংলা।
একই সঙ্গে চলতি বছর নেপালের কাঠমান্ডু রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির চাহিদার কথা বিবেচনা করে কুয়েত, বাহরাইন, মদিনা ও দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি চলছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন গন্তব্য হিসেবে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার জহুর বারু ও পেনাং এবং চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়েও ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালের মধ্যে।
শুধু এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না ইউএস-বাংলা। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজারে প্রবেশ। ২০২৮ সালের মধ্যে লন্ডন, রোমসহ ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে ফ্লাইট পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে নিউইয়র্ক, টরন্টো এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব রুট চালু হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে ইউএস-বাংলা। ২০২৫ সালে 'বেস্ট ডমেস্টিক এয়ারলাইন্স' হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একই স্বীকৃতি পেয়েছিল। এছাড়া ২০১৫ সালেও দেশের সেরা অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিল ইউএস-বাংলা। ধারাবাহিকভাবে এই স্বীকৃতি অর্জন প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান এবং যাত্রী আস্থার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।
সময়নিষ্ঠ ফ্লাইট পরিচালনা, আধুনিক উড়োজাহাজ, নিরাপত্তা, উন্নত কেবিন সার্ভিস এবং যাত্রীবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ইউএস-বাংলা দেশের মানুষের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ও বিদেশে প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগী খাতেও কর্মসংস্থান তৈরি করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ইউএস-বাংলা।
প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত সরকারকে কর ও সারচার্জ পরিশোধের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেও ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের একটি সক্ষম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলেছে ইউএস-বাংলা।
টিকিট বিক্রয় ও যাত্রীসেবাকে সহজ করতে ইউএস-বাংলা অনলাইনভিত্তিক নানা সুবিধা চালু করেছে। যাত্রীরা প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই টিকিট বুকিং করতে পারছেন। এছাড়া দেশে ও বিদেশে ইউএস-বাংলার নিজস্ব ৪০টিরও বেশি সেলস অফিস রয়েছে। পাশাপাশি কয়েক হাজার ট্রাভেল এজেন্সি এবং অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রয় ও সেবা প্রদান করা হচ্ছে। নিয়মিত যাত্রীদের জন্য চালু রয়েছে 'স্কাইস্টার' ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লাইয়ার প্রোগ্রাম, যার মাধ্যমে সদস্যরা বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা ও পুরস্কার উপভোগ করতে পারেন।
স্বাধীনতার পর ইউএস-বাংলাই প্রথম দেশীয় বিমান সংস্থা হিসেবে চীনের কোনো গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। একইভাবে ভারতের চেন্নাই এবং মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
যাত্রীসেবায় নতুন মানদণ্ড স্থাপনেও কাজ করছে ইউএস-বাংলা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণের মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে লাগেজ সরবরাহের উদ্যোগ যাত্রীদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। 'আপনি লাগেজের জন্য অপেক্ষা করবেন না, বরং লাগেজ আপনার জন্য অপেক্ষা করবে'—এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে কার্গো পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইউএস-বাংলা। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনে এই সেবা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক উন্নয়ন, ক্রীড়া এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
এক যুগপূর্তি উপলক্ষে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন হলেও ইউএস-বাংলা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। তিনি বলেন, আধুনিক উড়োজাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করছে, যাতে যাত্রীরা নিরাপদ, আরামদায়ক এবং বিশ্বমানের সেবা পান। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারা ইউএস-বাংলা পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এই বারো বছরের সফল যাত্রায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ট্রাভেল এজেন্ট, ট্যুর অপারেটর, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, দেশ-বিদেশের ব্যবসায়িক অংশীদার, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রত্যেকের সহযোগিতা, আস্থা ও সমর্থনের কারণেই ইউএস-বাংলা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। এক যুগপূর্তি উপলক্ষে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বারো বছরের পথচলায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স শুধু একটি বেসরকারি বিমান সংস্থা হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের বিমান পরিবহন শিল্পের অন্যতম সফল ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বহর সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, উন্নত যাত্রীসেবা, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতেও দেশের বিমান পরিবহন খাতে নেতৃত্ব ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



